আইন ও আদালত ২৩ আগস্ট, ২০১৯ ১০:০৭

তিন মাসেও ধরা পড়েনি সাংবাদিক হত্যাকারী

ডেস্ক রিপোর্ট।।
তিন মাস কেটে গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন পর্যন্ত তরুণ সাংবাদিক ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন হত্যাকাণ্ডের কোনো কুল-কিনারা করতে পারেনি। পুলিশের দাবি, 'হত্যার রহস্য উদঘাটনে তারা জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।'

গত ২১ মে ফাগুনকে হত্যা করে জামালপুর ও নান্দিনার মাঝামাঝি রানাগাছা এলাকায় রেললাইনের পাশে ফেলে রাখা হয়। সেদিন মধ্যরাতে ফাগুনের মরদেহ উদ্ধার করে জামালপুর রেলওয়ে পুলিশ। এরপর ২৪ মে ফাগুনের বাবা সাংবাদিক কাকন রেজা বাদী হয়ে জামালপুর রেলওয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জামালপুর রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাপস চন্দ্র পন্ডিত দাবি করেন, হত্যাকারীদের শনাক্ত ও ধরতে চেষ্টা করছে পুলিশ। বিভিন্ন অভিযান চালাচ্ছে।

তিন মাসেও তো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই-এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ‘আমরা কিছুটা এগিয়েছি। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে সব কথা বলতে পারছি না।’

ইহসান রেজা ফাগুন অনলাইন পোর্টাল প্রিয় ডটকমের ইংরেজি বিভাগের সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করতেন। মার্চে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়েছিলেন তিনি। আরেকটি নিউজ পোর্টাল জাগো নিউজের ইংরেজি বিভাগের সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী ফাগুনের দ্বিতীয় সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার পর বাড়ি গিয়েছিলেন ফাগুন। ২১ মে সকালে জাগো নিউজের অফিসে যোগদানের বিষয়ে কথা বলতে ঢাকায় আসেন। ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর ফাগুনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় পরিবারের সদস্যদের। পরে রাতে  জামালপুরের রানাগাছা নামক স্থানে ঢাকা-জামালপুর রেললাইনের পাশে তার মরদেহ পাওয়া যায়।

ফাগুনের পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের দাবি, পরিকল্পিতভাবে ফাগুনকে হত্যা করে রেললাইনের পাশে মরদেহ ফেলে রাখা হয়।

মামলার বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা জামালপুর রেলওয়ের থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রকিবুল হক এর আগে জানিয়েছিলেন, জামালপুরের ইসলামপুর এলাকা থেকে পাংখা নামে একজন এবং ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা থেকে তানজিল নামে একজন, মোট দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা মূলত অজ্ঞান পার্টির সদস্য। কিন্তু এদের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এসআই রকিবুল হক বলেন, মূলত আমরা ছিনতাইয়ের বিষয়টি মাথায় রেখেই এগুচ্ছি। যেহেতু নিহত সাংবাদিক ফাগুনের কাছে ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন ছিল, এজন্যও অজ্ঞানপার্টির লোকজন তাকে টার্গেট করতে পারে। তবে আমরা হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারটিও মাথায় রেখেছি। কারণ ছিনতাইকারীরা সাধারণত ছিনতাইয়ের পরে ট্রেনে থেকে ভিকটিমকে ফেলে দেয়। এতে ভিকটিমের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন থাকে। যদিও সাংবাদিক ইহসান রেজার গায়ে সে রকম কোনো চিহ্ন ছিল না। সুতরাং এটাকে কোনো সাধারণ ছিনতাইয়ের ঘটনা হিসাবে গণ্য করাও সম্ভব নয়।

যে এলাকায় সাংবাদিক ইহসান রেজা ফাগুনের মরদেহ পাওয়া যায়, সেখানের লোকজনও ঘটনাটিকে সাধারণ ছিনতাই বা ট্রেন থেকে পড়ে যাওয়া মানতে নারাজ। 

আব্দুল জলিল নামের যে ব্যক্তি প্রথম ফাগুনের মরদেহ দেখতে পান তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, সাধারণত ট্রেন থেকে কেউ পড়ে গেলে দূরে ছিটকে যাবার কথা। কিন্তু ফাগুনের মরদেহ ট্রেন লাইন থেকে দুই থেকে আড়াই ফুটের মধ্যে ছিল। তা ছাড়াও তার দেহ রেললাইনের পার্শ্বে শোয়ানো অবস্থায় ছিল এবং ট্রেন থেকে পড়লে এভাবে থাকার কথা নয়। ট্রেন থেকে কেউ পড়ে গেলে সাধারণত গায়ে যে ধরনের চিহ্ন থাকে তাও তার গায়ে ছিল না।

একই কথা বলেন স্থানীয় দোকানি রমজান মেম্বার। রমজান মেম্বার বলেন, ‘ট্রেন থেকে কেউ পড়ে গেলে সাধারণ ট্রেনের যাত্রীরা চিৎকার করে। কিন্তু সেদিন ট্রেন যাবার সময় এ ধরনের কোনো চিৎকার আমাদের কানে আসেনি।’

রমজান মেম্বার আরও বলেন, ‘আমার দোকান থেকে দুইশ মিটারের মধ্যে ওই সাংবাদিকের মরদেহ পড়ে ছিল। যদি ট্রেন থেকে পড়ত, তাহলে আমরা অবশ্যই টের পেতাম।’

ট্রেন থেকে না পড়লে কীভাবে এখানে ফাগুনের মরদেহ এলো, এমন প্রশ্নে রমজান মেম্বারের দোকানে জমায়েত লোকজন সন্দেহ করেন, এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য রয়েছে।

এদিকে ফাগুন হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিয়ে ছায়া তদন্ত করছে র‌্যাব-১৪। এ ছাড়াও পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), জামালপুরের নজরেও রয়েছে বিষয়টি। কিন্তু এতগুলো সংস্থার নজরে থাকা এবং রেলওয়ে পুলিশের কার্যক্রম সত্ত্বেও তিন মাস পার হলেও মামলাটির তেমন কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশ হয়েছেন ফাগুনের পরিবার ও তার সহকর্মীরা।

তাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। না হলে দ্রুত সময়ের মধ্যেও এর চেয়ে বড় ঘটনার রহস্য উদঘাটন হচ্ছে, অথচ তিন মাসেও ফাগুন হত্যার বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই।