মুক্তিযুদ্ধ ১১ নভেম্বর, ২০২০ ০৮:৫০

আহসান উল্লাহ মাস্টারের জন্মদিনে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা

প্রধানমন্ত্রীর সাথে আহসান উল্লাহ মাস্টার

প্রধানমন্ত্রীর সাথে আহসান উল্লাহ মাস্টার

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজনীতিতে যারা শুদ্ধাচার আনার চেষ্টা করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে তিনি প্রতিটি সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন মানুষের কল্যাণে। নিজের আসনটিকে (গাজীপুর-২) তৈরি করেছেন আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। তাই আধিপত্য বিস্তার করতে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল বিএনপির কর্মীরা। 
সেই বরেণ্য রাজনীতিবিদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের ৭০ তম জন্মদিন গেছে গত ৯ নভেম্বর। তার জন্মদিনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তিনি ১৯৫০ সালে গাজীপুরের পুবাইল ইউনিয়নের হায়দরাবাদ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার মাতা বেগম রোসমেতুন্নেসা ও বাবা পীর সাহেব শাহ সূফি আবদুল কাদের পাঠান। অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকায় ক্ষমতালোভী কুচক্রী মহলের হাতে তাকে নির্মমতার শিকার হতে হয় ২০০৪ সালের ৭ মে।

আহসান উল্লাহ মাস্টারের রাজনৈতিক জীবন: কিশোর বয়সেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা ঘটে আহসান উল্লাহ মাস্টারের। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি। রাজনীতির লড়াকু সৈনিক হিসেবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে উঠতে থাকে। তিনি পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতি চালিয়ে যেতে থাকেন। পরবর্তীতে হয়ে উঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের অনুসারী।
১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিযুক্ত করে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার চক্রান্ত করে। ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পরিচালনার জন্য তহবিল সংগ্রহ করার নিমিত্তে টঙ্গী-জয়দেবপুরের জন্য যে কমিটি গঠিত হয়েছিল, সেই কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন আহসান উল্লাহ মাস্টার। তিনি কমিটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে ‘মুজিব তহবিল’-এর জন্য প্রতিটি কুপন ১০ পয়সা করে বিক্রয় করেন। ১৯৬৬ এর ৬ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ এর এগার দফার আন্দোলনে সক্রিয় সদস্য ছিলেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন আহসানউল্লাহ মাস্টার। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ জয়দেবপুরের ক্যান্টনমেন্টের বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে ঢাকা থেকে আসা পাকিস্তানি বাহিনীকে ব্যারিকেড দিয়ে বাধা দেয়ার জন্য জনতাকে উদ্বুদ্ধ করার কাজে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর নেমে পড়েন দেশকে শত্রুমুক্ত করতে। তবে যুদ্ধ যাওয়ার আগেই নির্মম অত্যাচারের শিকার হন পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে। আহত অবস্থায় সাহসীকতার সাথে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ভারতের দেরাদুনের তান্দুয়া থেকে গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে পুবাইল, টঙ্গী, ছয়দানাসহ বিভিন্ন জায়গায় গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

প্রথম জনপ্রতিনিধি নির্বাচন: ১৯৮৩ সালে পুবাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম জনপ্রতিনিধিত্ব শুরু করেন। এরপর আর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তুমুল জনপ্রিয়তার কারণে দ্বিতীয় দফায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ১৯৮৮ সালে। এরপর ১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ তার সততা ও নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে গাজীপুর-২ থেকে তাকে মনোনয়ন দেন। দুইবারই গাজীপুর থেকে বিপুল ভোট পেয়ে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক ও কার্যকরি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য।

কর্মজীবন: তিনি শিক্ষক সমিতিসহ বিভিন্ন সমাজসেবামূলক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৯৬ সালে শ্রমিকদের জন্য ৯টি বস্ত্রকল নামমাত্র মূল্যে সমবায় সমিতির মাধ্যমে পরিচালনা করার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। আহসানউল্লাহ মাস্টার ১৯৮৩, ১৯৮৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯০, ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পটভূমিতে শ্রমজীবী নেতা হিসেবে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি শিক্ষকদের নেতা ছিলেন। টঙ্গীর শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিসেবে শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের সব কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে হয়ে ওঠেন সবার প্রিয়ভাজন।

শিক্ষাজীবন: আহসান উল্লাহ মাস্টারের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রামের হায়দরাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষাজীবন শেষ করে টঙ্গী হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে এসএসসি পাস করে তৎকালীন কায়েদে আযম কলেজে (বর্তমান শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজ) একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৭০ সালে ডিগ্রি পাস করার পর আহসানউল্লাহ টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীকালে তিনি ওই স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক (১৯৭৭-১৯৮৪) ও প্রধান শিক্ষকের (১৯৮৪-২০০৪) দায়িত্ব আমৃত্যু যোগ্যতার সঙ্গে পালন করেন। আহসানউল্লাহ মাস্টার টঙ্গী শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিসেবে সক্রিয় ছিলেন।