সারাদেশ ২৫ নভেম্বর, ২০২০ ০৬:২৬

যে কারণে ছেলেকে বেঁচে দিলেন মা!

ডেস্ক রিপোর্ট

দারিদ্র্যের চাপে নতজানু হয়ে ১৫ মাসের শিশুকে অন্যের কাছে দত্তক দিয়েছিলেন এক মা। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার উত্তর দলদলিয়া এলাকার করতোয়ার পাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। তবে এখন ওই গৃহবধূ দাম্পত্য পুনোরুদ্ধারসহ ভরণ-পোষণের দাবিতে আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক) ও জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থায় ১৫ নভেম্বর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

জানা যায়, থেতরাই ইউনিয়নের গোড়াইপিয়ার গ্রামের মৃত সৈয়দ আলীর ছেলে আনিছুর রহমান আনিছের সঙ্গে পারিবারিকভাবে ২০১১ সালের ২৭ মার্চ বিয়ে হয় দরিদ্র মৃত গফ্ফার আলীর কন্যা শেফালির। বিয়ের পর প্রায় আট বছরের সুখের সংসারে দুটি কন্যা সন্তানের মা হন শেফালি। প্রথম কন্যা আঁখি আক্তার মীমের বয়স এখন আট বছর। দ্বিতীয় কন্যা আশরাফি আক্তার অনন্যার বয়স ১৫ মাস। অভাব মেটাতে অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করত শেফালি। আর স্বামী করতো রাজমিস্ত্রির কাজ। তবে চলতি বছরের শুরুতে স্বামী প্রতিদিনই নেশা করে বাড়ি ফিরে খারাপ আচরণ শুরু করে। স্বামীকে নেশা ছাড়তে বললে প্রায়ই দ্বন্দ্ব-মারামারি লেগে থাকতো। গত এপ্রিলে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে আনিছুর রহমান বেধড়ক পিটিয়ে রক্তাক্ত ও মাথায় প্রচণ্ড আঘাতের ফলে শেফালি স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলে এবং একটি হাত বিকল হয়ে যায়।

এ অবস্থায় চতুর স্বামী আনিছুর অসুস্থ স্ত্রী ও দুই শিশু কন্যাকে বিধবা শাশুড়ির কাছে রেখে পার্শ্ববর্তী আপুয়ারখাতা গ্রামে দ্বিতীয় বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় চলে যান।

করোনাকালে দেশে লকডাউনের মধ্যে শেফালির হত-দরিদ্র বৃদ্ধা মা রমিছা খাতুন খাদ্য সংকটে পড়েন। ফলে অসুস্থ শেফালি ও তার দুই সন্তানের চিকিৎসা এবং ভরণ-পোষণ চালিয়ে আসা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবুও অনাহারে-অর্ধাহারে থেকে মেয়েকে সুস্থ করে জামাইয়ের বাড়িতে পাঠালেও ঠাঁই হয়নি শেফালির। ফলে নিরুপায় শেফালি বৃদ্ধা মায়ের অভাবি সংসারে বোঝা হয়ে মানবেতর জীবনযাপন শুরু করেন।

একদিকে করোনা পরিস্থিতি, অন্যদিকে দীর্ঘ মেয়াদী বন্যায় ঝিয়ের কাজে না থাকায় বৃদ্ধা রমিছার সংসারে নিদারুন খাদ্য সংকট ও নীরব দুর্ভিক্ষ চলছিল। এ অবস্থায় খাদ্যাভাবে প্রাণ বাঁচাতে রমিছা খাতুন শেফালির ১৫ মাসের সন্তানকে দত্তক হিসাবে অন্যের কাছে দিয়ে দেন।

শেফালির মা রমিছা জানান, স্বামীর নির্যাতনের শিকার শেফালির ১৫ মাস বয়সী ছোট মেয়ে আশরাফি আক্তার অনন্যাকে দলদলিয়া ইউনিয়নের দলবাড়ীর পাড় এলাকার নাউয়া পাড়া গ্রামের আনিছুর রহমানের কাছে তিন মাস আগে দত্তক দেয়া হয়েছে। আনিছুর রহমানের কোনো সন্তান নেই। ওখানে শিশুটি ভালো আছে।

শেফালি বেগম জানান, আমার স্বামী বিভিন্ন ধরনের নেশা করতো। নেশা করতে মানা করলে নির্যাতন চালাতো। সে গোপনে আমাকে ডিভোর্স দিয়েছে। আমাকে অসুস্থ অবস্থায় রেখে আরেকটা বিয়ে করে পালিয়ে গেছে। সে কোনো ভরণ-পোষণ দেয় না। আমি ছোট মেয়েকে দত্তক দিয়েছি। বড় মেয়েকে নিয়ে বিধবা মায়ের সঙ্গেই আছি। সে খাবারের জন্য বিভিন্ন জনের দিকে তাকিয়ে থাকে।

দলদলিয়া ইউপির ৬নং ওয়ার্ড সদস্য আনোয়ার খাঁ জানান, আনিছুর মাতাল হয়ে শেফালির উপর নির্যাতন চালাত। ঠিক মতো খাবার দিত না। বছরখানেক আগে সালিশির মাধ্যমে আনিছুরকে সংশোধন করলে সে স্ত্রী-সন্তানদের ভরণ-পোষণ দেবেন বলে স্বীকার করে। কিন্তু পরে আরেকটা বিয়ে করে পলিয়ে যায়।

থেতরাই ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী সরকার বলেন, বিষয়টি কেউ আমাকে বলেননি। বললে ব্যবস্থা নিতাম।

এ ব্যাপারে ঢাকায় কর্মরত অভিযুক্ত আনিছুর রহমান জানান, ‘কর্ম ব্যস্থতার কারণে বাড়িতে আসতে না পারায় বিষয়টির সুরাহা হয়নি। তবে ১০ ডিসেম্বর বাড়িতে এসে বিষয়টি সমাধান করবো।