বিনোদন ৩০ জানুয়ারি, ২০২১ ১২:৫০

আপাদমস্তক শিল্পী ছিলেন জহির রায়হান

বিনোদন ডেস্ক

বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার-ঔপন্যাসিক-গল্পকার জহির রায়হানকে আমরা কে না চিনি। তিনি একাধারে একজন কথাশিল্পী, আলোকচিত্রী, সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, ভাষাসংগ্রামী আর মুক্তিযোদ্ধার অভিধা ছাপিয়ে পরিচিত হয়ে ওঠা একজন চলচ্চিত্রকার।

তার আসল নাম আবু আবদাল মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ এবং ডাকনাম জাফর।

তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন শিল্পী, কি জীবন কি কাজে। বাংলাদেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ে কখনো তাঁর কলম লিখেছে, কখনো ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠেছে। মাঠে, ময়দানে, রাস্তায় সক্রিয় অংশগ্রহণ তো ছিলই। একুশের দিনগুলোকে যেমন দেখা যায় আরেক ফাল্গুন-এ, তেমনি একাত্তরের বিভৎস চিত্র উঠে এসেছে স্টপ জেনোসাইড এ। কী করে শিল্প দিয়ে জীবনকে প্রভাবিত করা যায়, তার উজ্জ্বল উদাহরণ তিনি তৈরি করেছিলেন।

১৯৭০ সাল এই গনগনে সময়ে ফেনীর মজুপুরের ছেলেটি একটি ছবি বানিয়ে বসলেন জীবন থেকে নেয়া নামে। সেই সময়ে জীবন থেকেই যেন গল্পগুলো জীবন্ত উঠে এসেছিল পর্দায়। 'একটি দেশ, একটি সংসার, একটি চাবির গোছা, একটি আন্দোলন' স্লোগান নিয়ে ছবিটি হয়ে উঠেছিল আইয়ুব খান ও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের শোষণকে তুলে ধরার এক শৈল্পিক প্রয়াস।

স্বাধীনতার বেশ আগেই ক্যামেরার সঙ্গে বন্ধুত্ব তাঁর। পড়তে গিয়েছিলেন ফিল্ম স্কুলেও। শেষ করতে পারেননি। তবে ততদিনে সহকারি হিসেবে অর্জন করেছে নানা অভিজ্ঞতা। পরিচালনায় পেয়েছেন এ জে কারদার ও সালাউদ্দিন কে।

তত দিনে এফডিসি প্রস্তুত। জহির রায়হান এবার পরিচালনায় হাত দিলেন। ১৯৬১ সালে মুক্তি পেল প্রথম ছবি কখনো আসেনি। তখন বয়স মোটে ২৬। সেই শুরু এটিসহ এক দশকের পথচলায় তিনি পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি বানিয়েছেন ১০টি। অন্যগুলো হলো সোনার কাজল, কাঁচের দেয়াল, সঙ্গম, বাহানা, বেহুলা, আনোয়ারা, একুশে ফেব্রুয়ারী, জীবন থেকে নেয়া ও লেট দেয়ার বি লাইট। শুধু পরিচালনা নয়, একটি নতুন চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিকে এগিয়ে নিতে ধরেছিলেন প্রযোজনার হাল। দুই ভাই, কুচবরণ কন্যা, জুলেখা, সুয়োরাণী দুয়োরাণী, সংসার ও মনের মতো বউ-এর মতো ছবিগুলো প্রযোজনা করেন তিনি।

শুধু তাই নয়, ১৯৬৪ সালে তাঁর নির্মিত উর্দু ছবি সঙ্গম ছিল সমগ্র পাকিস্তানের প্রথম রঙিন ছবি। ১৯৬৫ সালে নির্মিত তাঁর ছবি বাহানা পাকিস্তানের প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র। মনসামঙ্গল পুরাণ থেকে নির্মিত বেহুলা চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৬৬ সালের সেপ্টেম্বরে। এই চলচ্চিত্র বাংলাদেশকে পরিচয় করিয়ে দেয় এক নতুন অভিনেতার, একসময় যিনি রাজ্জাক নামে কাঁপিয়ে বেড়াবেন বাংলা চলচ্চিত্রে।

উল্লেখ্য, ১৯৩৫ সালের ১৯ আগষ্ট বর্তমান ফেনী জেলার সোনাগাজি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের মজুপুর গ্রামে জন্ম নেন তিনি।জহির রায়হান ব্যক্তিজীবনে দুইবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং দুজনেই ছিলেন তখনকার সময়ের স্বনামধন্য চিত্রনায়িকা। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবী যার সঙ্গে ১৯৬১ সালে বিয়ে হয়। প্রথম পরিবারে জন্ম নেয় অনল রায়হান এবং বিপুল রায়হান নামে দুই পুত্র সন্তান। সুমিতা দেবীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ১৯৬৮ সালে আরেক জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচন্দার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন তিনি। দ্বিতীয় পরিবারে রয়েছেন তার দুই সন্তান অপু রায়হান ও তপু রায়হান।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের মাসেই, ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকার মিরপুরে তার প্রাণের প্রিয় বড়ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে তিনি আর ফিরে আসেননি। কথিত আছে মিরপুরে বিহারী অঞ্চলে ছদ্মবেশী পাকিস্তানী সৈন্যদের গুলির আঘাতে তিনি পরলোকগমন করেন। তার মৃত্যুতে দেশ চিরদিনের জন্য হারায় এক মহান কিংবদন্তিকে... তার সিনেমার নামের মতো করেই বলতে হয়, এরপর আর “কখনো আসেনি”, জহির রায়হানের মতো নির্মাতা।