মুক্তমত ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০১:৫৬

‘রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি’

ডেস্ক রিপোর্ট

“শহরের আট শতাংশ দরিদ্র পরিবার না খেয়ে ঘুমাতে যায়; শহরের ১২ শতাংশ দরিদ্র পরিবারে খাবার নেই; শহরের ২১ শতাংশেরও বেশি দরিদ্র পরিবারে পর্যাপ্ত খাবার নেই; সারাদিনে একবেলাও খেতে পায়নি প্রায় তিন শতাংশ শহুরে দরিদ্র পরিবার; সাত শতাংশ পরিবার কম পরিমাণে খাবার খাচ্ছে” – তথ্যগুলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) একটি সাম্প্রতিক গবেষণার যা গত ২১ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে।

এটুকু জেনে অনেকেই হয়তো বলবেন করোনাকালীন সময়ে মানুষের জীবিকা সংকটে পড়েছিল, তাই…। কিন্তু এই জরিপটি চলে ২০১৯ সালের ৮ থেকে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত, অর্থাৎ করোনা বাংলাদেশে ঘোষিত হওয়ার তিন মাসেরও বেশি সময় আগের।

‘উন্নয়নের মহাসড়কে’ থাকা বাংলাদেশের জন্য খবরটি নিশ্চয়ই স্বস্তিদায়ক নয়। তবে দুঃসংবাদ এখানেই শেষ নয়। ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায় গত দেড় দশকে দ্রুত দারিদ্র্য কমানোর প্রতিযোগিতায় শীর্ষ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ নেই। ওই ১৫টি দেশ যে গতিতে দারিদ্র্য কমিয়েছে, বাংলাদেশে কমেছে এর চেয়ে কম গতিতে। এই তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার ভারত ও পাকিস্তান থাকলেও নেই বাংলাদেশ। শীর্ষ ১৫ দেশের তালিকায় আছে তানজানিয়া, তাজিকিস্তান, চাদ, কঙ্গো, কিরগিজস্তান, চীন, ভারত, মালদোভা, বারকিনো ফাসো, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ইথিওপিয়া, পাকিস্তান ও নামিবিয়া। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় এই দেশগুলোর বেশির ভাগই আফ্রিকার। এসব দেশে মোট ৮০ কোটি মানুষ ওই দেড় দশকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠেছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে দারিদ্র্য সীমার উপরে ওঠা মানুষের সংখ্যা চীনে ৫০ কোটি, ভারতে ১৬ কোটি, ইন্দোনেশিয়ায় ৬ কোটি, পাকিস্তানে ৩ কোটি ৩৮ লাখ আর বাংলাদেশে মাত্র ৫০ লাখ। সংস্থাটির হিসাবে বাংলাদেশে এখনও সোয়া ২ কোটি হতদরিদ্র লোক আছে। দারিদ্র্য কমার হার এখানে কমেছে আর বিস্ময়করভাবে বেড়েছে বৈষম্য। অথচ গত এক দশক আমরা জিডিপি’র উচ্চ প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির গল্প শুনেছি ক্রমাগত।

উপরের এই দু’টো পরিসংখ্যানই করোনার আগের কথা। আর করোনাতো পুরো বিশ্বকেই ফেলে দিয়েছে এক ভয়াবহ জীবন আর জীবিকার চ্যালেঞ্জে। উন্নত বিশ্ব যেখানে হিমশিম খাচ্ছে এই জীবন আর জীবিকার ভারসাম্য রাখতে সেখানে বাংলাদেশের মতো দেশের কথা বলাই বাহুল্য। কোভিড পরবর্তী এক জরিপে গবেষণা সংস্থা সানেম জানায় করোনার প্রভাবে সার্বিক দারিদ্র্য হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে।

বিবিএস খানা জরিপ অনুসারে দেশের গ্রামাঞ্চলের সার্বিক দারিদ্র্য যেখানে ছিল ২৬.৪%, ২০২০ সালে করোনার প্রভাবে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫.৩ শতাংশে। একইভাবে শহরাঞ্চলে এই হার যেখানে ছিল ১৮.৯%, ২০২০ এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫.৪ শতাংশে। করোনার সময় মানুষের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সবকিছু খুলে দিয়ে অর্থনীতি চালু রাখার পরও দারিদ্র্যের যে পরিস্থিতি হয়েছে তাতেই প্রমাণিত হয় এই দেশের প্রান্তিক মানুষ কতটা ভঙ্গুর।

এই ভঙ্গুর মানুষদের জন্য এই রাষ্ট্র কী করছে সেটার একটা দলিল পাওয়া যায় জাতিসংঘের এশীয় ও প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (ইউএনএসক্যাপ) ‘দ্য প্রটেকশন উই ওয়ান্ট: সোশ্যাল আউটলুক ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। এই অঞ্চলে জিডিপিতে স্বাস্থ্যবহির্ভূত সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের হারের দিক থেকে শীর্ষ দুটি দেশ হচ্ছে ইরান এবং তুরস্ক যেগুলোতে এই খাতে ব্যয় যথাক্রমে মোট জিডিপির ১০.১ শতাংশ এবং ৯.৯ শতাংশ। শ্রীলংকায় এ হার ৫.২ শতাংশ। এছাড়া ভারতের জিডিপির ৩.২ শতাংশ, মালদ্বীপের ২.৯, নেপালের ২.১, পাকিস্তানের ১.৮, আফগানিস্তানের ১.৮ ও ভুটানের ১ শতাংশ স্বাস্থ্যবহির্ভূত সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় করা হয়। এদিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশে এর হার মাত্র ০.৭ শতাংশ। অর্থাৎ পাকিস্তান, এমনকি আফগানিস্তানের মতো দেশও এই খাতে ব্যয় করে বাংলাদেশের আড়াই গুণ।

বরাদ্দ অতি ‘তুচ্ছ’ কোনও সন্দেহ নাই, কিন্তু এর চাইতেও মারাত্মক প্রশ্ন হচ্ছে এই ‘তুচ্ছ’ বরাদ্দের কতটুকু প্রান্তিক মানুষের হাতে পৌঁছে? সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের (এনএসএসএস) মধ্যবর্তী উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত ভাতাভোগীদের ৪৬ শতাংশের বেশি ভাতা পাওয়ার যোগ্য নয়। এর মধ্যে দরিদ্র না হয়েও ত্রাণ পায় ৫৬%, বয়স্ক ভাতার শর্ত পূরণ করে না ৫৯%, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতায় ভূমিহীন শর্ত পূরণ করে না ২৩%, ভিজিডির ক্ষেত্রে ভূমিহীন বা সামান্য ভূমির অধিকারী হবার শর্ত পূরণ করে না ৪৭%, ভিজিএফ এ ভূমির শর্ত পূরণ করে না ৫৬%।

সামাজিক নিরাপত্তায় কারা আসে? দেশে বর্তমানে ২৩ টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৪৩টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আছে। এদের মধ্যে আছে সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত, পিছিয়ে পড়া মানুষ, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বিধবা/তালাকপ্রাপ্ত নারী যাদের নিজেদের জীবিকার সংস্থান করার সামর্থ্যটুকু পর্যন্ত নাই, তারাই মূলত রাষ্ট্র প্রদত্ত সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আসে। উন্নত দেশগুলোতে যে অবস্থায় থাকলে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আসা যায়, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দরিদ্র দেশে সেই অবস্থার মান আরও বেশ খানিকটা নিচে। তারপরেও সামাজিক নিরাপত্তায় যে অপ্রতুল বরাদ্দ সেটাও যদি সঠিকভাবে, সঠিক মানুষের হাতে তুলে দেওয়া যেত, তাহলে গবেষণা বলছে দারিদ্র্যের হার অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব। আলোচিত রিপোর্টটিতেই বলা হয়েছে অনিয়ম দূর করে সঠিক লোকের কাছে এসব কর্মসূচির সহায়তা পৌঁছে দিতে পারলে কোনও বাড়তি ব্যয় ছাড়াই আরও ২৬ লাখ পরিবারের ১ কোটি ৭ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচ থেকে এক ঝটকায় তুলে আনা সম্ভব।

এই ৪৬ শতাংশ অনিয়মের কথা বলা হলেও এই অনিয়ম মূলত দুর্নীতিরই আরেকটি রূপ। এই দুর্নীতি মূলত দুইভাবে হয়।

এক. যারা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আসার যোগ্য, তাদেরকেও ঘুষ দিয়ে তালিকাভুক্ত হতে হয়।

দুই. কোনও যাচাই বাছাই ছাড়াই জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসন এই কর্মসূচির আওতায় আসার যোগ্য না হলেও নিজেদের পছন্দসই মানুষদের তাতে অন্তর্ভুক্ত করে।

গত ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত ‘উন্নয়নে অন্তর্ভুক্তি এবং প্রতিবন্ধিতা: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক রিপোর্টে জানায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্ত, সুবর্ণ কার্ড ও ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে ১০০ থেকে ৩ হাজার হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। সমাজের প্রান্তিকদের মধ্যেও সবচাইতে প্রান্তিক মানুষ প্রতিবন্ধী মানুষদের সামাজিক নিরাপত্তায় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রেই যদি এই পরিস্থিতি হয় তাহলে অন্যসব ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কী, সেটা খুব সহজেই অনুমেয়। সব দুর্নীতিই ক্ষতিকর এবং নিশ্চিত ভাবেই শাস্তিযোগ্য। কিন্তু কিছু অনিয়ম আর দুর্নীতি এতটাই বীভৎস যে কোনও শাস্তিই তার জন্য যথেষ্ঠ হয় না। সমাজের সবচেয়ে অসহায়, দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য বরাদ্দ নিয়ে করা অনিয়ম আর দুর্নীতি তেমনই এক অপরাধ।

লেখক: রুমিন ফারহানা, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য