জাতীয় ২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০৯:৪৪

পার্বত্য চুক্তির ২২ বছরেও পাহাড়ে শান্তি অধরা

ডেস্ক রিপোর্ট।।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি সইয়ের ২২ বছর পূর্তি আজ । কিন্তু চুক্তির মূল ধারাগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ে বেড়েছে অবিশ্বাস, টানাপোড়েন আর শঙ্কা। পাহাড়ের মানুষের মাঝে বিরাজ করছে নানা হতাশা ও উৎকণ্ঠা। সরকারের পক্ষ থেকে চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি নেই বলেও অভিযোগ তাদের।

পার্বত্য শান্তি চুক্তি সইয়ের দুদশক পেরিয়ে গেলেও, চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে নানা অভিযোগ পাহাড়িদের। মূল ধারাগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ার পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।  সরকারের পক্ষ থেকে চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ তাদের।

রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার বলেন, 'যারা শান্তি চুক্তি মানে না, 'শান্তি চুক্তির বিরোধীতা করে তাদের পক্ষে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। অধিকাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে ভূমি কমিশনের কাজ আমরা এখনও শুরু করতে পারি নাই।'

রাঙামাটি সার্কেল চিফ, চাকমা সার্কেল রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় বলেন, 'পার্বত্য চট্টগ্রামে একাধিক দল, এগুলো যা বলছেন, আমার মতে এগুলো কিছুই না। আইন শৃংঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষ হতে হবে।'

সরকারের ৩৩টি বিভাগের মধ্যে ১৭টি বিভাগ জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বন ও পরিবেশ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, সাধারণ প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগসহ আরো অনেক বিভাগ হস্তান্তর করা হয়নি ২২ বছরেও।

আমলাই, বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলন সভাপতি জুয়ামলিয়ান বলেন, 'ভূমি কমিশন কার্যকর হলে আমরা ধরে নেব পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।'

 জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি  অংচমং মারমা বলেন, 'সরকার ভূমি কমিশন দ্রুত কার্যকর করলে আমার মনে শান্তি শৃংঙ্খলা ফিরে আসবে।'

পর্যায়ক্রমে সব চুক্তি বাস্তবায়নের কথা জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং। তিনি বলেন, 'গুরুত্বপূর্ন কয়েকটি ধারা আছে, যেগুলো আমরা ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।'

চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন করে সরকার। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির দাবি, ২২ বছরেও চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন হয়নি।

চুক্তির প্রতিটি অংশ দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, উন্নয়ন ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হবে- এই প্রত্যাশা সবার।

চলতি ২০১৯ সালে পাহাড়ে খুন-রাহাজানির চিত্র


প্রশাসনিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, চলতি বছর ২০১৯ সালের শুরুতেই জানুয়ারীর ৪ তারিখে বাঘাইছড়ির বাবু পাড়ায় ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয় বসু চাকমাকে। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০২, তারিখ-০৫/০১/২০১৯ইং। ২৯শে জানুয়ারী লংগদুতে পবিত্র কুমার চাকমাকে হত্যা করা হয়। লংগদু থানার মামলা নং-০৬,তারিখ-৩০/০১/১৯ইং।
ফেব্রুয়ারীর ০৩ তারিখে চন্দ্রঘোনার পূর্ব কোদালায় হত্যা করা হয় মিতালী মারমাকে। চন্দ্রঘোনা থানার মামলা নং-০১, তারিখঃ-০৩/০২/১৯। ০৪ তারিখে চন্দ্রঘোনার ভাল্লুকিয়ায় গুলি করে মোঃ জাহেদ (২৫) ও মংসুইনু মারমা (৪০)কে হত্যা করা হয়। চন্দ্রঘোনা থানার মামলা নং-০২, তারিখঃ-০৫/০২/১৯। একইদিনে রাঙামাটি সদরের বালুখালী ইউপিস্থ ২নং ওয়ার্ডের মধ্যপাড়া গ্রামস্থ কাপ্তাই হ্রদ থেকে তাকে ভোতা অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়। কোতয়ালী থানার মামলা নং-০৭, তারিখ-০৪/০২/১৯।
মার্চের ০৭ তারিখে বাঘাইছড়ির বঙ্গলতলী বি-ব্লকে উদয় বিকাশ চাকমা ওরফে চিক্কোধন চাকমা (৩৮) কে গুলি করে হত্যা করা হয়। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০২, তারিখ:২২/০৪/২০১৯। ১৮ই মার্চে নির্বাচন শেষে ফেরাপথে বাঘাইছড়ির নয়কিলোতে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অতর্কিত ব্রাশ ফায়ারে মোঃ আমির হোসেন (৩৭); মোঃ আলা আমিন (১৭); মিহির কান্তি দত্ত (৪০); জাহানারা বেগম (৪০); বিলকিস আক্তার (৪০); মন্টু চাকমা (২৫) ও আবু তৈয়বসহ মোট ৮জনকে হত্যা করা হয়। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০২, তারিখ-২০/০৩/২০১৯। মার্চের ১৯ তারিখে বিলাইছড়িতে আ:লীগের জনপ্রিয় নেতা সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাকে গুলি করে হত্যা। বিলাইছড়ি থানার মামলা নং-০১, তারিখ-২৩/০৩/২০১৯।
এপ্রিলের ৩ তারিখে রাজস্থলীর পোয়াইতু পাড়ায় মায়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মধ্যে গোলাগুলিতে ৭ জন নিহতের খবর পাওয়া গেলেও প্রশাসন বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। তবে স্থানীয় একাধিক সূত্র থেকে সেদিন গোলাগুলির খবরটি জানা গেছিলো। মে মাসের ৮ তারিখে রাঙামাটির বরকল উপজেলায় হত্যার শিকার হয় আপ্রুসে মারমা (৩২)। ১৯শে মে চন্দ্রঘোনায় আ:লীগের নেতা ক্যহলাচিং মারমা (৪৭) কে গুলি করে হত্যা করা হয়। চন্দ্রঘোনা থানার মামলা নং-০১, তারিখঃ ২০/০৫/১৯ইং। জুন মাসের ২৭ তারিখে শুভলংয়ে সৃতিময় চাকমা ওরফে কোকো (৩২)কে গুলি করে হত্যা করা হয়। বরকল থানার মামলা নং-০৪, তারিখ-২৯/০৬/২০১৯। জুলাইয়ের ১ তারিখে চন্দ্রঘোনায় মা ¤্রাসাং খই মারমা (৬০) ও মেয়ে মে সাংনু মারমা(২৯)কে নিজ বাসার ভেতরে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। চন্দ্রঘোনা থানার মামলা নং-১, তারিখ-০৩/০৭/২০১৯। ১১ই আগষ্ট ২০১৯ইং তারিখে বাঘাইছড়িতে এ্যানো চাকমা এবং তার সহযোগী স্বতঃসিদ্ধি চাকমাকে গুলি করে হত্যা করে। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০২, তারিখ-১৪/০৮/২০১৯। ১৮আগষ্ট ২০১৯ইং তারিখে রাজস্থলীর পোয়াতু পাড়ায় সেনাবাহিনীর সৈনিক মোঃ নাসিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। রাজস্থলী থানার মামলা নং-০২, তারিখ-২৬/০৮/২০১৯। ২৩ আগষ্ট তারিখে বাঘাইছড়ির সাজেকে কসাই সুমন ওরফে লাকির বাপ (৪৫) কে গুলি করে হত্যা করা হয়। সাজেক থানার মামলা নং-০৪, তারিখ-২৩/০৮/২০১৯খ্রিঃ। সেপ্টেম্বর মাসের ১৭ তারিখ বাঘাইছড়িতে হত্যা করা হয় রিপেল চাকমা (২৫) ও বর্ষণ চাকমা (২৪)নামে দুইজনকে। অক্টোবর মাসের ৯ তারিখ ভোররাতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে বাঙ্গালহালিয়ার কাকড়াছড়ি সুইচ গেট এলাকায় অংসুইঅং মারমা (৪৫) নিহত হয়। ২৩শে অক্টোবর রাজস্থলী উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি হেডম্যান দ্বীপময় তালুকদারকে গুলি করে হত্যা। সর্বশেষ চলতি মাসের গত ১৮ই নভেম্বর ২০১৯ইং সোমবার সন্ধ্যারাতে গাইন্দ্যা ইউনিয়নের বালুমুড়া মারমা পাড়া এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় তিনজনকে। রাজস্থলী থানায় দায়েরকৃত মামলা নাম্বার-১। তারিখ: ২০/১১/২০১৯ইং।
এদিকে, বিগত ২০১৮ সালে রাঙামাটি জেলায় হত্যার শিকার হয়েছে ২৮জন। রাঙামাটির পুলিশ বিভাগ, বিভিন্ন সংস্থা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে বিগত ২০১৮ সালের মার্চে-৩, এপ্রিলে-৬, মে-৯, জুন-২, জুলাই-১, আগষ্ট-২, সেপ্টেম্বর-২, অক্টোবর-৩ জনসহ ১ বছরে শুধু রাঙামাটিতেই আধিপত্যের লড়াইয়ে নির্মম হত্যার শিকার হয়েছে ২৮ জন। 
প্রাপ্ত তথ্যানুসারে ২০১৮ সালের মার্চ মাসের ০৩ তারিখে বাঘাইছড়ির বঙ্গলতলীতে নতুন মনি চাকমাকে খুন করে স্বজাতীয় সন্ত্রাসীরা। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০২, তারিখ-১১/০৩/২০১৮। মার্চের ১৫ তারিখে লংগদু’র ৭নং লংগদু ইউপিস্থ দজরপাড়া বাজারে নিরীহ রঞ্জন চাকমা ওরফে জঙ্গলি চাকমা (২৭)কে হত্যা করা হয়। লংগদু থানার মামলা নং-০১,তারিখ-১৮/০৬/১৮। মার্চের ৫ তারিখ সোমবার রাজস্থলীর তাইতংয়ের চুশাক পাড়ায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে হত্যা। এলাকার জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এপ্রিলের ১১ তারিখে নানিয়ারচরের সাবেক্ষ্যংয়ের হেডম্যান পাড়ায় জনি ওরফে সুনীল তঞ্চঙ্গ্যাকে হত্যা করা হয়। নানিয়ারচর থানার মামলা নং-০১,তারিখ-১২/০৪/২০১৮ইং। ১২ই এপ্রিল নানিয়ারচরে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হয় সাধন চাকমা ও কালোময় চাকমা। নানিয়ারচর থানার মামলা নং-০৫, তারিখ-২৬/০৪/২০১৮ইং। একই দিনে ক্যাঙ্গালছড়ি ব্রীজের দক্ষিন পার্শ্বে অজ্ঞাতনামা পাহাড়ি সন্ত্রাসীর গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। নানিয়ারচর থানার মামলা নং-০২, তারিখ-১২/০৪/২০১৮। ১৫ই এপ্রিল বাঘাইছড়িস্থ মারিশ্যা আটকিলো রাবার বাগানে বিজয় চাকমা(৩২)কে গুলি করে হত্যা। ২০ এপ্রিল কাপ্তাইয়ের রেশমবাগানে মোঃ ইব্রাহিম খলিল (২৭)কে গলা কেটে হত্যা। মে মাসের ০৩ তারিখে নানিয়ারচরে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ্যাড: শক্তিমান চাকমাকে। এই ঘটনায় নানিয়ারচর থানার মামলা নং-০২, তারিখ-০৮/০৫/২০১৮। ৪ই মে’ নানিয়ারচরের বেতছড়িতে গনতান্ত্রিক ইউপিডিএফ’র প্রধান তপন জ্যোতি বর্মাসহ তার সাথে থাকা তনয় চাকমা (৩১), সুজন চাকমা (৩০), সেতু লাল চাকমা, (৩৬) ও বাঙালি মাইক্রোবাস চালক মো. সজীবকে (৩৫)নির্মমভাবে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। নানিয়ারচর থানার মামলা নং-০৩, তারিখ-০৮/০৫/২০১৮। ২৮শে মে সাজেকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করা হয়, অটল চাকমা(৩০), স্মৃতি চাকমা(৫০) ও সঞ্জিব চাকমা(৩০)কে। সাজেক থানার মামলা নং-০১, তারিখ-০২/০৬/২০১৮। ১৭ই জুন বাঘাইছড়ির রূপকারীতে সুরেন বিকাশ ওরফে ডাক্তার বাবুকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০৪, তারিখ-১৮/০৬/২০১৮। ১৮ই জুন চন্দ্রঘোনার নারানগিরী মূখ এলাকায় আমেসে মার্মা(৪৫) নামক একজনকে হত্যা করা হয়। চন্দ্রঘোনা থানার মামলা নং-০১, তারিখ-১০/০১/২০১৮।
জুলাইয়ের ২৬ তািরখে বাঘাইছড়ির বঙ্গলতলীতে বন কুসুম চাকমাকে খুন করা হয়। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০১, তারিখ-২৯/০৭/২০১৮। আগষ্টের ১৮ তারিখে চন্দ্রঘোনার আমতলীঢালা এলাকায় উথোয়াইচিং মার্মা(৫০)কে হত্যা করা হয়। চন্দ্রঘোনা থানার মামলা নং-০২, তারিখ-২৭/০৩/২০১৮। আগষ্টের ২৪ তারিখে বাঘাইছড়ির বঙ্গলতলীতে খুন হয় মিশন চাকমা। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০৩,তারিখ-২৪/০৮/২০১৮। সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখে নানিয়ারচরের রামসুপারি পাড়ায় যোদ্ধ মোহন চাকমা ওরফে আর্কষণ চাকমা (৪২) ও শ্যামল কান্তি চাকমা(৩৫)কে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় নানিয়ারচর থানার মামলা নং-০২, তাং-২৪/০৯/১৮। অক্টোবর মাসের ০৩ তারিখে বাঘাইছড়ির তুলাবানে কল্পনা চাকমা ও বিন্দা চাকমাকে খুন করা হয়। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০১, তারিখ-০৬/১০/২০১৮। ১৭ই অক্টোবর নানিয়ারচরের বিহার পাড়ায় খুন হয় শান্ত চাকমা। নানিয়ারচর থানার মামলা নং-০১, তারিখ: ২০/১০/১৮।