অর্থ ও বাণিজ্য ১৩ অক্টোবর, ২০২০ ০৪:১১

১ কেজি আলুর দামে দুই কেজি চাল ! (ভিডিও)

রায়হান শোভন

‘টাকায় আট মন চাল’ বা ‘বেশী করে আলু খান, ভাতের উপর চাপ কমান’। লোকমুখে এই কথাগুলো এতোটাই গত হয়েছে যে, আজকের বাজারের না গেলে বুঝা দায়। গেলো সপ্তাহ থেকে আলুর দাম বেড়ে চলতি সপ্তাহে ছুঁয়েছে নাজিরশাই চালকে। এখন বাজারে প্রতি কেজি নাজিরশাই চাল বিক্রি হয় গড়ে ৫৫ টাকায়, একই দাম আলুর। তবে রংপুরের লাল আলু বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। অথচ এই ৮০ টাকায় সাধারণ মানের দুই কেজি চাল কিনতে পাওয়া যায়।

বাজার দরের এই পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে আলু। বিগত এক যুগ বা তার আগে কখনোই দেশের মানুষ আলুর এতো বেশি দাম দেখিনি। বিগত বছরগুলোতে আলুর মৌসুমে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হতো ১৫ থেকে ২০ টাকায়। এছাড়া সবজির বাজারেও আগুন। টানা মাসখানেক ধরে রাজধানীর বাজারগুলোতে কোনো সবজিই মিলছে না ৮০ টাকার নিচে। এতে বিপাকে পড়েছেন দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবার।

বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ বছর বন্যা ও করোনা পরিস্থিতির কারণে বিগত বছরের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে আলুর দাম। রাজধানীতে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। তবে বরাবরের মত লাভ থেকে বঞ্চিত কৃষক।

সরেজমিনে কারওয়ান বাজার: আজ মঙ্গলবার কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত সপ্তাহের মত প্রতি কেজি আলু ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে খুচরা বাজারে না কমলেও পাইকারি বাজারে কমেছে আলুর দাম। পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৪২ থেকে ৪৩ টাকায়। যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ৪৫ থেকে ৪৬ টাকায়।

আলুর দাম বেশি প্রসঙ্গে কারওয়ান বাজারের খুচরা আলু বিক্রেতা মোহাম্মদ মেহেদি হাসান পলাশ আমাদের কাগজকে বলেন, করোনার সময় মানুষ বেশি বেশি আলু কিনেছে। অনেক মানুষ আলু, চাল, ডাল দিয়ে মানুষকে সহযোগিতা করছে। এ ছাড়া বর্তমানে জমিতে বন্যার পানি থাকার কারণে আলু আবাদ করা যাচ্ছে না। মজুদ করা আলুও শেষ হওয়ার পথে। তাই দাম বেশি। বাজারে নতুন আলু না আসলে খুব বেশি একটা দাম কমার সম্ভবনা নাই বলেও তিনি জানান।

অন্যদিকে প্রতি কেজি ঢেঁড়স বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। প্রতি কেজি বরবটি ৮০ টাকায়, গাজর ৮০ টাকায়, করলা ৮০ টাকায়, উস্তা ১০০ টাকায়, ধুন্দল ৮০ টাকায়, বেগুন ৮০ টাকায়, ঝিঙা ৮০ টাকায়, চিচিঙ্গা ৮০ টাকায় ও পটল বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। তবে ৫০ টাকা ও তার নিচে বিক্রি হচ্ছে কিছু সবজি। পেঁপে ৩০ থেকে ৪০ টাকা, কচুর লতি ৫০, কচুর মুখি ৫০, মিষ্টি কুমড়ার প্রতি ফালি ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কাঁচামরিচের ঝাঁল ছাড়িয়ে গেছে অন্য সব ধরনের সবজিকে, প্রতি কেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। তবে ২৫০ গ্রাম কাঁচামরিচ বিক্রি করা হচ্ছে ৬০ টাকা থেকে ৭০ টাকায়।

কাঁচামরিচের উচ্চমূল্য সম্পর্কে জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের খুচরা কাঁচামাল বিক্রেতা শামীম আমাদের কাগজকে বলেন, এখন জমিতে মরিচের সেভাবে উৎপাদন নেই। বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম তাই দাম বেশি। জানুয়ারিতে নতুন কাঁচামরিচ আসলে দাম কমতে পারে।

তবে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে শীতকালীন আগাম সবজিতে, গত সপ্তাহে ৪০ থেকে ৫০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া বাঁধাকপি ও ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হওয়া শিম বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। লাউ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৮০ টাকায় ও মুলা ৬০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। পেঁয়াজের ঝাঁজও কমেনি। প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকায়। গত মাসে ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই এমন চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ।

তেঁজগাও মডেল হাই স্কুল সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ মোস্তাফুজুর রহমান আমাদের কাগজকে বলেন, বাজারের সবকিছুর মূল্যই ঊর্ধ্বগামী। সকল কিছুই ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। সংসার চালাতে খুব হিমসিম খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, করোনার কারণে বিগত ৭ মাস স্কুল বন্ধ, তাই বেতনও পাচ্ছি না। আমাদের কিছু বন্ধুবান্ধব বিদেশ থাকে তাদের কাছ থেকে নিয়মিত ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। বাজারের এরকম অস্থিতিশীল অবস্থা চলতে থাকলে কিছুদিন পর না খেয়ে থাকতে হবে।

হাতিরপুলে স্যানেটারি দোকানে কাজ করেন রুহুল আমিন। প্রতি মাসে বেতন পান ১৫ হাজার টাকা। দুই ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে তার সংসার। করোনার কারণে স্ত্রীকে পাঠিয়ে দিয়েছেন গ্রামের বাড়িতে। বর্তমানে তিনি থাকেন কাঁঠালবাগানের একটি মেসে। প্রতি মাসে সেখানে থাকা বাবদ তার খরচ ২৫০০ টাকা। সেখানে খাবার বাবদ তাঁর খরচ হয় ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। রুহুল আমিন আমাদের কাগজকে বলেন, বাজারে সকল সবজির দাম বেশি। যে আয় তা দিয়ে চলা খুব কঠিন হয়ে গেছে। বাসায় মাঝে মাঝে বেশি টাকা দিতে হয়। সে সময় তিন বেলার পরিবর্তে আমাকে দুই বেলা খেয়ে থাকতে হয়। মাসের বিশ তারিখের পরে পকেটে চা খাওয়ার টাকাও থাকে না।

কারওয়ান বাজারের খুচরা কাঁচামাল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শামীম আমাদের কাগজকে বলেন, বন্যার কারণে অনেক ফসলি জমি নষ্ট হয়ে গেছে। তাই বাজারে সব সবজির আমদানি কম। আমদানি বাড়লে সবজির দাম কমে যাবে।

আমেনা উত্তর সিটির দলিতদের কাজ করেন, ছেলেমেয়ে ৩ জন। বেতন পান ১৪ হাজার টাকা। আমাদের কাগজকে তিনি বলেন, বাজারে কোনো সবজিই ধরা যায় না। কিন্তু কি করবো খেয়েতো বাঁচতে হবে, তাই আগে যেখানে বেশি সবজি কিনতাম এখন কম কিনি, কম খাই।

কারওয়ান বাজারের খুচরা সবজি বিক্রেতা মোহাম্মদ জুলহাস মিয়া আমাদের কাগজকে জানান, বন্যার কারণে পাইকাররা বেশি দামে আমাদের কাছে সবজি বিক্রি করছে। তাই বাধ্য হয়ে আমাদেরও বেশি দামে দামে সবজি বিক্রি করতে হচ্ছে।

ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন