???? ২০ জানুয়ারি, ২০২৩ ০৪:২৬

পুঁজি হারানোর শঙ্কা কৃষকের

২৬ টাকায় বীজ কিনে ১২ টাকায় বিক্রি

নিজস্ব প্রতিবেদক : দিনাজপুরে নতুন আলু বাজারে তুলে প্রত্যাশা অনুযায়ী দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। বর্তমানে ১১-১২ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করছেন তারা। অথচ ২৬ টাকা কেজিতে এসব আলুর বীজ কিনেছেন কৃষকরা। পাশাপাশি সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ায় এবার উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সেইসঙ্গে পরিবহন খরচ দিয়ে বাজারে আলু এনে লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। এ অবস্থায় পুঁজি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন অনেক কৃষক।

এদিকে, দাম কম পাওয়ায় হিমাগার থেকে গত বছরের আলুও তোলেননি অনেক কৃষক ও ব্যবসায়ী। নির্ধারিত সময়ের বেশি সময় ধরে হিমাগারে আলু রাখায় লোকসান গুনতে হচ্ছে উভয়ের।

কৃষকরা জানিয়েছেন, ২৬ টাকা কেজিতে বীজ কিনে জমিতে রোপণ করেছেন। সেই আলু ১১-১২ টাকায় বিক্রি করছেন। উৎপাদনসহ যাবতীয় খরচ দিয়ে আলু চাষ করে এখন লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে জেলায় ৪৮ হাজার ৫৯০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আবাদ হয়েছে ৪৭ হাজার ৩৯০ হেক্টর জমিতে। এসব জমিতে ১০ লাখ ৭০ হাজার ৩২৬ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে ২৭ হাজার ৬৭৭ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে সাত লাখ ৪০ হাজার ৫৮৪ মেট্রিক টন। পঞ্চগড়ে ৯ হাজার ৮৭০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে দুই লাখ ১৭ হাজার ৬১০ মেট্রিক টন।

২০২২-২৩ অর্থবছরে দিনাজপুর অঞ্চলের তিন জেলায় ৭৯ হাজার ৯১৪ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ইতোমধ্যে ৭৯ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষাবাদ হয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৪ হাজার ৯৬৪ হেক্টর জমি। তবে উৎপাদন হয়েছে ৪৩ হাজার ৮৮৫ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার কম জমিতে আলু উৎপাদন হলেও ফলনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা কৃষি অধিদফতরের।

জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় হিমাগারের সংখ্যা ১৩টি। সবগুলো হিমাগার মিলিয়ে আলু ধারণক্ষমতা এক লাখ ১৬ হাজার ১০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ আলু বীজের। বাকিগুলো খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদন এবং আলুর বহুমুখী ব্যবহার সম্ভব হলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা লাভবান হতেন।’

আলু চাষ করে পুঁজি হারানোর শঙ্কায় আছি জানিয়ে সদর উপজেলার উলিপুর এলাকার কৃষক ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে বাজারে আলুর কেজি ১১-১২ টাকায় বিক্রি করছি। এতে এক বিঘা জমির আলু বিক্রি করে ৪০-৪৫ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। অথচ আলু চাষে প্রতি বিঘায় ৫০-৫৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলে আমার লোকসান হচ্ছে। যদি ১৫-১৬ টাকা দরে বিক্রি করতে পারতাম তাহলে লোকসান না হলেও খরচটা উঠতো।’ 

প্রতি বছর লাভের আশায় আলু চাষ করে লোকসান দিচ্ছি উল্লেখ করে এই কৃষক বলেন, ‘প্রতি বছর লোকসান দিতে হয়। বিঘাপ্রতি কোনও কোনও বছর ১০-৩০ হাজার টাকা লোকসান হয়। আলু চাষ করে এভাবে কতবার লোকসান দেবো? আগামী বছর আলুর পরিবর্তে অন্য ফসল চাষ করবো।’

২৬ টাকায় বীজ কিনে ১২ টাকায় আলু বিক্রি করছি জানিয়ে একই এলাকার কৃষক নাগিব মোর্শেদ বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে ৫০ কেজির ১৩-১৪ বস্তা আলু বীজ লাগে। প্রতি কেজি বীজ ২৬ টাকায় কিনেছি। এবার সার, কীটনাশক, জমি চাষ ও শ্রমিক খরচসহ প্রতি বিঘায় ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সবকিছুর দাম বেড়েছে, তবে আলুর দাম বাড়েনি। বিঘায় প্রায় ৮০ বস্তা আলু হয়। এক বিঘা জমির আলুর দাম যদি এক লাখ টাকা হতো তাহলে খরচ বাদে কিছুটা লাভ হতো। কিন্তু এবার ১২ টাকা দাম পাচ্ছি। এই দাম পেলে পুঁজি হারানো ছাড়া কোনও পথ দেখি না।’

আলু চাষ করে কৃষকদের লোকসান হচ্ছে জানিয়ে দিনাজপুরের আলু ব্যবসায়ী ইকবাল হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে নতুন আলু ১১-১২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন কৃষকরা। খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৫-১৮ টাকায়। এতে লোকসান হচ্ছে কৃষকদের। উৎপাদন ভালো হওয়ায় বাজারে চাহিদার তুলনায় আমদানি বেশি। তাই আলুর দাম কম।’

পুরাতন আলুতেও লোকসান হচ্ছে উল্লেখ করে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘গত বছর হিমাগারে যে আলু রেখেছিলাম, কেনা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত কেজিপ্রতি খরচ পড়ছে ১৯ টাকা। অথচ সেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে ১৩-১৫ টাকায়।’

দিনাজপুর শহরের আলু ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান বলেন, ‘বাজারে নতুন আলুর দাম বেশি থাকলে পুরাতন আলু কিনতেন ক্রেতারা। কারণ তখন পুরাতন আলু কম দামে পাওয়া যেতো। কিন্তু এখন নতুন আলুর দামই কম। পুরাতন আলু কেউ কিনতে চায় না। ফলে পুরাতন এবং নতুন আলুতে লোকসান হচ্ছে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের।’

একই কথা বলেছেন পূর্ণভবা কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক রেজাউল। তিনি বলেন, ‘আমাদের হিমাগারে আলু রাখা ও নেওয়ার নির্ধারিত সময় হচ্ছে মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। কিন্তু আলুর দাম কমে হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের বাইরেও হিমাগারের মেশিন চালানো লাগছে। এক মাসের বিদ্যুৎ বিল প্রায় ১২ লাখ টাকার মতো আসে। এই টাকা পুরোটাই লোকসান। বীজ আলু তোলার সর্বশেষ সময় ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত। খাওয়ার আলু তোলা শেষ হয় নভেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু আলুর দাম কমে যাওয়ায় গত দুই বছর ধরে জানুয়ারি পর্যন্ত আলু ডেলিভারি হচ্ছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা হিমাগার থেকে আলু তুলতে চান না। কারণ তাদের যাতায়াত খরচটাই উঠছে না। ২৫ টাকার বীজ আলু যদি পাঁচ টাকায় বিক্রি হয় তাহলে কি গ্রাহকরা তুলবে? এতে কৃষক থেকে শুরু করে হিমাগার মালিকদের লোকসান হচ্ছে। কৃষকদের আলু যদি ৩০ টাকায় বিক্রি হতো তবে লাভ হতো। কিন্তু কৃষক ও ব্যবসায়ীরা হিমাগার থেকে আলু না তুললে আমাদের লোকসান হয়।’

দিনাজপুর অঞ্চলে গত বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আলু উৎপাদন বেশি হয়েছে জানিয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক শাহ আলম বলেন, ‘এ বছরও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন বেশি হবে বলে আশা করছি। আবহাওয়া অনুকূলে আছে। তবে এবার বাজারে আলুর দাম কম।’

এ বিষয়ে জেলা সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘জেলায় সর্বমোট হিমাগার রয়েছে ১৩টি। জেলায় প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়। এর মধ্যে এক লাখ ১৬ হাজার ১০ মেট্রিক টন আলুর ধারণক্ষমতা হিমাগারগুলোতে আছে। হিমাগারে থাকা আলুর মধ্যে মাত্র ৩৫ শতাংশ খাওয়ার জন্য এবং বাকিগুলো বীজ হিসাবে ব্যবহার হয়।’ 

আলুর দাম বাজারে কম কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আলুর রফতানি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আলুর বহুমাত্রিক ব্যবহার বাড়াতে হবে। আমি মনে করি প্রতি বছর চাহিদার ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে উৎপাদন করলে বাজারে আলুর দাম বাড়বে। কেননা চাহিদার তুলনায় আমদানি বেশি হলে বাজারে দাম কমবে—এটাই স্বাভাবিক।’

আমাদেরকাগজ/ এইচকে