সারাদেশ ৮ আগস্ট, ২০২৩ ১২:১০

পানিতে ভাসছে চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: কয়েকদিন যাবত টানা ভারি বর্ষণে পানিতে ভাসছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। নগরীর কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর, আবার কোথাও বুক সমান পানি। এ অবস্থায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে ছিন্নমূল মানুষ। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।

সোমবার (৭ আগস্ট) নগরীর পানিবন্দি কয়েকটি এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে এই দুর্ভোগের কথা জানা গেছে।

টানা চারদিন ধরে পানিতে তলিয়ে আছে নগরীর চক সুপার মার্কেট। সোমবার দুপুরে দেখা যায়, এই বিপণি কেন্দ্রের নিচতলার সব দোকান বন্ধ। সেখানে হাঁটু সমান পানি জমে আছে। তবে দুপুরের দিকে কাপাসগোলা, বাদুরতলা, কাতালগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় পানি সকালের তুলনায় কিছুটা কম ছিল। কিন্তু বিকেলের দিকে জোয়ারের পানি প্রবেশ করায় সেখানে কোমর সমান পানি জমে যায়।

বাদুরতলা মাজার গেইট এলাকার বাসিন্দা আবু জাফর বলেন, গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে রাতে দিনে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে ভাসছি। চুলায় রান্না করতে পারছি না। বাজারে যেতে পারছি না। ঘরে খাবার নাই। ওয়াসার পানি আসছে নোংরা। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকটেও পড়েছি। এ যেন নরক যন্ত্রণায় ভুগছি।

নগরীর মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা খাইরুজ্জামান লিটন মুঠোফোনে বলেন, গত চারদিন ধরে আমরা পানিবন্দি। ঘরে খাবার নাই। পানি নাই। কেউ একটু খোঁজ পর্যন্ত নিতে আসেনি। এভাবে আর দুইদিন থাকলে তো পরিবারের সবাই মারা পড়ব।   

এমন অবস্থায় আবহাওয়া অধিদফতরও কোনো সুখবর দিতে পারেনি। মৌসুমী বায়ু প্রবল থাকায় আগামী ২৪ ঘণ্টায়ও চট্টগ্রামে অতি ভারি বর্ষণের আভাস দিয়েছে পতেঙ্গা আবহাওয়া অধিদফতর।

অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ উজ্জল কান্তি পাল বলেন, দুই দিনে চট্টগ্রামে মোট ৪৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। বৃষ্টি আরও দুদিন থাকবে।    

নগরীর চকবাজার ফুলতল এলাকার বাসিন্দা মো. মনজুরুল ইসলাম বলেন, চারদিন ধরে আমরা পানিতে আটকা। শুরুতে দুইদিন বিকেলে পানি কমেছিল একটু। রোববার থেকে পানি আবার বেড়ে গেছে। ঘরের মধ্যে এখন হাঁটু পানি। চুলায় আগুন জ্বালাতে পারছি না। কিভাবে আছি, ছেলেমেয়ে নিয়ে খাওয়া-দাওয়া কিভাবে করছি, সেটা আমরাই শুধু জানি। এভাবে আর কতদিন? কষ্টেরও তো একটা সীমা আছে।

আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে চট্টগ্রামে বৃষ্টি শুরু হয়। রাতভর টানা বৃষ্টির পর শুক্রবার সকালে জোয়ার শুরু হলে নগরীর বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যায়। শনিবার সকাল ও দুপুরেও জলাবদ্ধতা ছিল। এরপর শনিবার আবারও রাতভর তুমুল বর্ষণে নগরীর নতুন নতুন এলাকা তলিয়ে যায়।

রোববার বেলা ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে ২১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এদিন চট্টগ্রাম মহানগরীর বহদ্দারহাট, বাদুরতলা, কাপাসগোলা, চকবাজার, ফুলতল, চেয়ারম্যান ঘাটা, কে বি আমান আলী সড়ক, দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর, কাতালগঞ্জ, আরাকান রোড, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, ডিসি রোড, হালিশহরের কয়েকটি এলাকা, সল্টগোলা-ইপিজেড সড়ক, বড়পোলসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর, এমনকি বুক সমান পানি জমে যায়।

ওই দিন দুপুর থেকেই নগরীর চান্দগাঁও শমসেরপাড়া, ঈশান মিস্ত্রীর হাট, অক্সিজেন মোড়, মৌলভী পুকুর পাড়, আনন্দবাজার, হালিশহরের এল ব্লক, পুলিশ লাইন, শাপলা আবাসিক এলাকা, শান্তিবাগ ও হাজীপাড়া এলাকায় পানি বাড়তে থাকে।

পরে বিকেলের টানা বর্ষণে আগ্রাবাদের নতুন এলাকা, সিডিএ আবাসিক এলাকা, মুহুরী পাড়া, বেপারী পাড়া, মিস্ত্রী পাড়াসহ হালিশহরের বিভিন্ন ব্লক পানিতে তলিয়ে যেতে থাকে। সন্ধ্যার কিছু বিরতি দিয়ে রাত ১০টার পর আবারও শুরু হয় প্রবল বৃষ্টি। রাত সাড়ে এগারোটায় জোয়ার শুরু হয়। এই জোয়ারে আগ্রাবাদ ও হালিশহরের অধিকাংশ এলাকা তলিয়ে যায়।

সোমবার সকালে বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, কাপাসগোলা এলাকায় রোববারের তুলনায় পানি কম ছিল। তবে আগ্রাবাদ ও হালিশহরের বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর পানি ছিল।

নগরীর আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা কামাল উদ্দিন জানান, শুক্রবার বিকেল থেকে ওই এলাকায় পানি ঢুকেছে। নিচতলা প্রায় সম্পূর্ণ পানির নিচে। পানির মোটর থেকে সবকিছুই তলিয়ে গেছে। এখন খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।

নগরীর চান্দগাঁও এলাকার সমশের পাড়ার ছিন্নমুল বস্তির বাসিন্দা ছানোয়ার হোসেন জানান, গত চার দিন ধরে বস্তির দেড় হাজার বাড়ি পানিতে তলিয়ে আছে। চুলায় আগুন জ্বলছে না। আমরা খাদ্য সংকট নিয়ে ছোট ছেলে-মেয়েদের জীবন বাঁচাতে এক ধরনের যুদ্ধ করছি।

 

আমাদেরকাগজ/এইচএম