সারাদেশ ৮ আগস্ট, ২০২৩ ০৪:০৬

ছুটির দিনে গ্রাম আদালতে যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু, চেয়ারম্যানকে বাদ দিয়ে মামলা,ক্ষোভ

ছবি - সংগৃহীত

ছবি - সংগৃহীত

নওগাঁ প্রতিনিধি: গ্রাম আদালতের বিচারকক্ষে এক যুবককে নির্যাতন করে হত্যার পর মরদেহ ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। জানা যায়, মৃত্যুর আগে ওই যুবক নওগাঁর পোরশায় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যানের হেফাজতে ছিলেন।  

নিহত ৩৬ বছর বয়সী ওই যুবকের নাম লাফারু ইসলাম।

গত শুক্রবার সকালে উপজেলার নিতপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। তবে মূল অভিযুক্ত হলেও চেয়ারম্যানকে বাদ দিয়ে দুই গ্রাম পুলিশকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে মামলা হয়। এতে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা।

নিহতের পরিবার জানায়, ভাঙারি দোকান থেকে উদ্ধার হওয়া চুরি যাওয়া একটি বাইসাইকেল নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। 

বৃহস্পতিবার বিকেলে নিতপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের গ্রাম আদালতে লাফারু ইসলাম ও আশিক নামে দুই যুবকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন সাইকেলের মালিক। ঘটনার একদিন না পেরোতেই শুক্রবার সকালে ইউপি চেয়ারম্যানের নির্দেশে গ্রাম পুলিশ পাঠিয়ে ইউপি কার্যালয়ে তুলে আনা হয় দুই যুবককে। এর কয়েক ঘণ্টা পর দুপুরে গ্রাম আদালতের বিচার কক্ষে লাফারু ইসলামের মরদেহ ঝুলতে দেখেন স্থানীয়রা। 

ঘটনাটি চারদিক ছড়িয়ে পড়ায় ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে স্থানীয়দের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। পরে বিকেলে সেখানে গিয়ে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নেয় পুলিশ।

নিহত লাফারুর সঙ্গে তুলে নিয়ে যাওয়া আশিক হোসেন বলেন, ‘ওইদিন লাফারু ও আমাকে গ্রাম আদালতে নিয়ে হাত-পা বেঁধে দফায় দফায় মারপিট করা হয়। সেখানে মাথার ওপর পা তুলে দেয়াসহ নানা ধরনের নির্যাতন করা হয়।

‘লাফারুকে মেরে ফেলার জন্য ১০ বিঘা জমি বিক্রি করতে হলেও তিনি (চেয়ারম্যান) প্রস্তুত- বলে গ্রাম পুলিশদের নির্দেশ দিচ্ছিলেন। তার এই কথা শোনা মাত্রই লাফারুর বুকে ও মুখে বাঁশ দিয়ে আরও আঘাত করতে থাকেন গ্রাম পুলিশরা। একপর্যায়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। পরে লাফারুর মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। যাতে দেখে মনে হয় আত্মহত্যা।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রাম আদালতের কক্ষ থেকে মরদেহ বের করার পর ক্ষমতাসীন স্থানীয় নেতারা ম্যাজিস্ট্রেটসহ পুলিশকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফনের জন্য প্রভাবিত করেন। ওই সময় লাফারুর মায়ের কাছ থেকে বেশ কিছু কাগজে টিপসই নেয়া হয়। বিষয়টি বুঝতে পেরে মরদেহ সেখানে আটকে দেন স্থানীয়রা। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠাতে সম্মত হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

নিহত লাফারুর ভাবি জোসনা বেগম বলেন, ‘মরেদহ থানায় নিয়ে গেলে সেখানে মামলা করার জন্য গিয়েছিলাম। তবে আমাদের মামলা নেয়া হয়নি। পুলিশ বলেছিল, তারাই মামলা করবে।

‘পুলিশের সামনেই ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা, আশ্রায়ণের ঘর এবং ভাতার কার্ড করে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়েছে। তবে আমরা রাজি না থাকায় পরের দিন বাধ্য হয়ে মরদেহ ময়নাতদন্তে পাঠিয়েছে।’

‘এরপর শুনছি শাশুড়ির থেকে টিপসই নেয়া কাগজে চেয়ারম্যানকে বাদ দিয়েই মামলা করেছে। এখানে চেয়ারম্যানকে আড়াল করা হচ্ছে। আমরা এ ঘটনায় জড়িত সবার শাস্তি চাই।’

লাফারুর চাচা সোহরাব আলী বলেন, ‘শরীরে আঘাতের চিহ্ন যাতে কারো নজরে না আসে সেজন্য মরদেহের আশপাশে কাউকে যেতে দেয়া হচ্ছিল না।

‘লাফারুকে মেরে তার গলায় লুঙ্গি পেঁচিয়ে জানালার গ্রিলে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। ছুটির দিন গ্রাম আদালত বসানোর নামে লাফারুকে এনে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর সঙ্গে সরাসরি চেয়ারম্যান জড়িত। অবিলম্বে চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।’

লাফারুর মৃত্যুর পর নওগাঁ থেকে ঢাকায় সটকে পড়েন নিতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনামুল হক। এ বিষয়ে জানতে মোবাইল ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাকে না জানিয়ে গ্রাম পুলিশরা লাফারুকে ধরে এনেছিল। পরে শুনছি তার মরদেহ নাকি গ্রিলে ঝুলছিল। মেয়ের পরীক্ষার জন্য ঢাকায় এসেছি। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’

নওগাঁর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) গাজিউর রহমান বলেন, 'গ্রাম আদালত থেকে ওই যুবকের মরদেহ উদ্ধারের পর সেখানে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সুরতহাল করা হয়। তার শরীরে বেশ কিছু আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রকৃত অর্থে এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যা, সে বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে জানা যাবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় দুইজন চৌকিদার গ্রেপ্তার আছে। ওই যুবককে আটক করে রাখার প্রক্রিয়াটা কতটুকু আইনসম্মত ছিল, তা নিরপেক্ষ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

আমাদেরকাগজ/এমটি