অপরাধ ও দুর্নীতি ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০৭:০৬

আইডিয়ালের সাবেক অধ্যক্ষ শাহান আরারকে দুদকের নোটিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগমের নামে রাজধানীর বসুন্ধরা ও উত্তরায় দুটি প্লট, আফতাবনগর ও সূত্রাপুরে দুটি ফ্ল্যাট এবং ব্যাংক হিসাব ও সঞ্চয়পত্র মিলিয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। 

দালিলিক তথ্য অনুযায়ী, স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে তার নামে প্রায় চার কোটি টাকার সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে। যদিও বাস্তবে এসব সম্পদের মূল্য কয়েক গুণ বেশি বলে জানা গেছে। তার অর্জিত সম্পদের উৎস জানতে এরই মধ্যে নোটিশ পাঠিয়েছে দুদক।

শাহান আরা বেগম বর্তমানে রাজধানীর আফতাবনগরের এভারকেয়ার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ আছে, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে লুটপাট করে আনা টাকা থেকে ২০ কোটি টাকা খরচ করে ১০ তলা বিশিষ্ট নিজস্ব ভবনে ওই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে অধ্যক্ষের নেতৃত্বাধীন ‘সিন্ডিকেট’।

যদিও বিভিন্ন সময় শাহান আরা বেগম দাবি করেছেন যে, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সত্য নয়। সম্পদের নোটিশ ও অবৈধ সম্পদের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা পোস্টের পক্ষ থেকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হয় অধ্যক্ষ শাহান আরাকে। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার মোবাইল নম্বরে খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।

এ বিষয়ে দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, যেকোনো অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে কমিশন থেকে অনুমোদন দেওয়ার পর অনুসন্ধান শুরু হয়। আইডিয়ালের সাবেক অধ্যক্ষের দুর্নীতির বিষয়েও দুদক আইন ও বিধি অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বিবরণ

দুদকের অনুসন্ধানে অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগমের বিরুদ্ধে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে প্রায় চার কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। যা তার আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করে সংস্থাটি। দালিলিক মূল্য আমলে নেওয়ায় তার স্থাবর সম্পদের মূল্য অনেক কম এসেছে। বাস্তবে এসব সম্পদের মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

স্থাবর সম্পদের বিবরণের বিষয়ে আয়কর নথি ও দুদকের বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায়, অধ্যক্ষ শাহান আরার নামে বসুন্ধরায় ২.৫ কাঠার একটি প্লট, রাজধানীর সূত্রাপুরে ১৭৪০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, উত্তরার হরিরামপুরে ২.৫ কাঠার একটি প্লট এবং আফতাবনগরে ১৪৯০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট আছে। সবমিলিয়ে এক কোটি ৭০ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য মিলেছে।  

যেকোনো অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে কমিশন থেকে অনুমোদন দেওয়ার পর অনুসন্ধান শুরু হয়। আইডিয়ালের সাবেক অধ্যক্ষের দুর্নীতির বিষয়েও দুদক আইন ও বিধি অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন
দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন।

অন্যদিকে, অস্থাবর প্রায় দুই কোটি টাকার তথ্য পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ২৬ লাখ টাকার এফডিআর, প্রায় ২০ লাখ টাকার ডিপিএস উল্লেখযোগ্য। এছাড়া টয়োটা মডেলের একটি গাড়ির মালিকানা রয়েছে তার নামে।

সম্পদ বিবরণী নোটিশে যা বলা হয়েছে

দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের সত্যতা পাওয়ায় চলতি বছরের মে মাসে কমিশনে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করেন দুদকের সহকারী পরিচালক আতাউর রহমান সরকার ও উপ-সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়ার সমন্বয়ে গঠিত অনুসন্ধান টিম। তাদের প্রতিবেদনের সুপারিশ আমলে নিয়ে গত ২৩ জুলাই দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে সাবেক আইডিয়াল অধ্যক্ষ বরাবর সম্পদের নোটিশ ইস্যু করা হয়।

সম্পদের নোটিশে বলা হয়, বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করে দুদকের স্থির বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনি আপনার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। আপনি আপনার নিজ ও আপনার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তির নামে-বেনামে অর্জিত যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, দায়-দেনা, আয়ের উৎস এবং তা অর্জনের বিস্তারিত বিবরণ কমিশনে দাখিল করবেন।

এ আদেশ পাওয়ার ২১ কার্যদিবসের মধ্যে নির্ধারিত ছকে সম্পদ বিবরণী দাখিলে ব্যর্থ হলে কিংবা মিথ্যা সম্পদ বিবরণী দাখিল করলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এর ৫ (২) ধারা অনুযায়ী আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

অধ্যক্ষ শাহান আরার নামে বসুন্ধরায় ২.৫ কাঠার একটি প্লট, রাজধানীর সূত্রাপুরে ১৭৪০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, উত্তরার হরিরামপুরে ২.৫ কাঠার একটি প্লট এবং আফতাবনগরে ১৪৯০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট আছে। সবমিলিয়ে এক কোটি ৭০ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য মিলেছে। অস্থাবর প্রায় দুই কোটি টাকার তথ্য পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ২৬ লাখ টাকার এফডিআর, প্রায় ২০ লাখ টাকার ডিপিএস উল্লেখযোগ্য। এছাড়া টয়োটা মডেলের একটি গাড়ির মালিকানা রয়েছে তার নামে।

অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগমের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের যোগসাজশে শিক্ষার্থী ভর্তি বাবদ অনৈতিকভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

২০১৯ সালে মতিঝিল শাখায় এসএসসি ফরম পূরণে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণেরও অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। টেস্ট পরীক্ষায় যেসব শিক্ষার্থী অনুত্তীর্ণ হন তাদের কাছ থেকে বিষয় প্রতি ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত গ্রহণ করে ফরম পূরণের সুযোগ দেন অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম। পরে ‘বিশেষ বিবেচনায়’ ওই পরীক্ষার্থীদের উত্তীর্ণ করা হয়।

এছাড়া আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বনশ্রী ও মুগদা শাখায়ও শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে অনৈতিকভাবে টাকা নেওয়ার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। 

জানা যায়, শিক্ষার্থী প্রতি চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। প্রাথমিকভাবে স্কুল ফান্ডে ওই টাকা জমা হলেও পরবর্তী সময়ে অধ্যক্ষসহ ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা তা ভাগ করে নেন। এভাবে শাহান আরা বেগম দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।

দুদকের অনুসন্ধানে শাহান আরা বেগমের স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে প্রায় চার কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। 
২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ‘বিশেষ ক্লাসের’ নামে বাধ্যতামূলক অর্থ আদায়ের অভিযোগ পেয়ে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বনশ্রী শাখায় অভিযান চালায় দুদকের একটি দল। ওই অভিযানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মেলে। ওই সময় অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত জব্দ করে দুদক।

বিভিন্ন সময় শাহান আরা বেগম দাবি করেছেন যে, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সত্য নয়। সম্পদের নোটিশ ও অবৈধ সম্পদের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা পোস্টের পক্ষ থেকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হয় অধ্যক্ষ শাহান আরাকে। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার মোবাইল নম্বরে খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।

২০১৯ সালের মে মাসে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার উত্তরপত্র ঘষামাজা করে নম্বর দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ড।

অভিযোগ রয়েছে, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান খান অধ্যক্ষ শাহান আরার অনিয়ম-দুর্নীতির প্রধান সহকারী ছিলেন। তার বিরুদ্ধেও পৃথক একটি অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। ভিশন- ৭১ ডেভেলপার কোম্পানির মালিক আতিক ও অধ্যক্ষ শাহান আরা মিলে লুটপাট চালিয়ে নামে-বেনামে নতুন করে একাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। 

জানা গেছে, আফতাব নগরে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠিত ১০ তলা ভবনের এভারকেয়ার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের আর্থিক জোগানও এসেছে তাদের দুর্নীতির অর্থ থেকে। এ প্রতিষ্ঠানেরও বর্তমান অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম।

অধ্যক্ষ শাহান আরার বক্তব্য

২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর অধ্যক্ষ শাহান আরাকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদকের অনুসন্ধান টিম। দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আতাউর রহমান ও উপ-সহকারী পরিচালক আফনান কেয়ার নেতৃত্বে একটি দল তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ওই দিন প্রায় তিন ঘণ্টা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। দুদক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন অধ্যক্ষ শাহান আরা।

সব অভিযোগ অস্বীকার করে ওই সময় তিনি বলেন, ‘অভিযোগের সত্যতা নেই, নীতিবহির্ভূত কোনো কাজ হয়নি। ভর্তি-বাণিজ্যের বিষয়টি আমার জানা নেই। এত বড় প্রতিষ্ঠান, এখানে গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভর্তি করা হয়। কেউ বাণিজ্য করে থাকলে তা আমার জানার কথা নয়।

শাহান আরা বেগম ১৯৯০ সালে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ২০০০ সালের নভেম্বর মাসে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি। ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০০৪ সালের আগস্টে তিনি অধ্যক্ষ হন। তখন থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শাহান আরা বেগম।

আমাদেরকাগজ / এইচকে