জাতীয় ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৩ ১০:১৯

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন

এমপি হাইয়ের অনুসারী তিন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনে নৌকার প্রার্থী আব্দুল হাইয়ের অনুসারী এক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও দুই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের পৃথক অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে নির্বাচন কমিশন। এসব ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরসহ যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি। এখন নির্বাচন কমিশনের অনুমতি সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হতে যাচ্ছে বলে কমিশন সূত্র জানিয়েছে।

ঝিনাইদহ-১ আসনে নৌকার প্রার্থী আব্দুল হাইয়ের বিরুদ্ধে প্রচারে বাধা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে গত ২২ ডিসেম্বর রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর অভিযোগ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী নজরুল ইসলাম দুলাল বিশ্বাস। অভিযোগে ট্রাক প্রতীকের এ প্রার্থী উল্লেখ করেন, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে শৈলকুপা উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নে ট্রাক মার্কার কোনো পোস্টার ও প্রচারে মাইক ব্যবহার করতে দিচ্ছে না ইউপি চেয়্যারম্যান শিকদার ওয়াহিদুজ্জামান ইকু ও তার ক্যাডার বাহিনী। অপরদিকে ধলাহরচন্দ্র ইউনিয়নেও প্রতিনিয়ত ব্যানার ও পোস্টার টাঙাতে না দেওয়াসহ প্রচার মাইক ব্যবহারে বাধা প্রদান করছে ইউপি চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান বিশ্বাস, তার ছেলে দিনার বিশ্বাস ও ইউপি সদস্য চঞ্চল। এছাড়া নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নৌকার প্রার্থী আব্দুল হাই ও তার অনুসারীরা একের পর এক আচরণবিধি লঙ্ঘন করেই চলেছে।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঝিনাইদহ-১ আসনে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যান, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মো. গোলাম নবী সরেজমিনে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ ও অন্যান্য প্রক্রিয়া গ্রহণপূর্বক তদন্ত প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশন সচিবালয় বরাবর দাখিল করেছেন।


তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৪ ডিসেম্বর সকালে সরেজমিনে গিয়ে হাকিমপুর ইউনিয়নে কোথাও নৌকা প্রতীকের পোস্টার ব্যতীত অন্য কোনো প্রতীকের পোস্টার দেখতে পাননি নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি। সেখান থেকে ফেরার পথে দুপুরে শৈলকুপা পৌরসভার হল বাজার এলাকা থেকে প্যাকেট করা দুই ভ্যান বিরিয়ানি জব্দ ও ভ্যানচালকদের জবানবন্দি গ্রহণ করেন অনুসন্ধান কমিটি।

ভ্যানচালক মো. বিশারত ও খাইরুল বলেন, খাবারের প্যাকেটগুলো তারা ইকু চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে নিয়ে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সভায় যাচ্ছেন। বিরিয়ানি জব্দের খবর শুনে হাকিমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইকু শিকদার তার দলবল নিয়ে গাড়ি ও মোটরসাইকেলযোগে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যানের সাথে ঔদ্ধত্য আচরণ করেন ইকু চেয়ারম্যান এবং খাবারের প্যাকেটগুলো তার বাড়ি থেকে তৈরি করে সভায় নেওয়া হচ্ছে বলে স্বীকার করেন। এ সময় তার সঙ্গে থাকা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেজাউল ইসলাম খাবারের প্যাকেটগুলো বিতরণের জন্য নিয়ে যাচ্ছেন বলে স্বীকার করে ক্ষমা চান ও জবানবন্দি দেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওইদিন বিকেলে শৈলকুপা সরকারি ডিগ্রি কলেজের বিপরীতে অবস্থিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মিলনায়তনের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায়, হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের নেতা-কর্মীদের নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম, যুবলীগের সভাপতি শামিম হোসেন মোল্যাসহ অন্যান্যরা সভা করছেন। সভা শেষে তাদের মধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় থেকে ওই খাবারের প্যাকেট পরিবেশন করা হয়। যা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ ও সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮ এর বিধি ১০(চ) এর সুস্পষ্ট লংঘন।

এদিকে গত বুধবার (২৭ ডিসেম্বর) শৈলকুপা উপজেলার মিনগ্রামে কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী নজরুল ইসলাম দুলাল বিশ্বাস ও নৌকার প্রার্থী আব্দুল হাই। দুই প্রার্থীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যান, যুগ্ম জেলা জেলা ও দায়রা জজ মো. গোলাম নবী সরেজমিনে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ ও অন্যান্য প্রক্রিয়া গ্রহণপূর্বক তদন্ত প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশন সচিবালয় বরাবর দাখিল করেছেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ডিসেম্বর সকালে আবাইপুর ইউনিয়নের মীন বাজারের কাছে মোল্যাপাড়ায় আমিরুলের দোকানে গিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হারুন শেখ ও নবীরন নেছার জবানবন্দি গ্রহণ করে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি। এছাড়া হাট ফাজিলপুর পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই সাজেদুর রহমান ও স্থানীয় লোকজনদের সাথে কথা বলে অনুসন্ধান কমিটি।

সার্বিক অনুসন্ধানে জানা যায়, ২৬ ডিসেম্বর মাগরিবের নামাজের পরে ট্রাক প্রতীকের সমর্থকরা মিছিল বের করে। পরে ট্রাক প্রতীকের সমর্থকরা মোল্যাপাড়ায় অবস্থিত আমিরুলের চায়ের দোকানে বসে ছিলেন। এমন সময় নৌকা প্রতীকের আনুমানিক ১০০-১৫০ জনের সমর্থকরা মীন বাজার থেকে মিছিল বের করে মোল্যা পাড়ার দিকে আসতে থাকে। তখন দায়িত্বরত পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই সাজেদুরসহ তিন পুলিশ সদস্য তাদের আমিরুলের চায়ের দোকানের দিকে যেতে বাধা দেন। কিন্তু নৌকা প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে কামরুল ও উকিল মুসল্লিসহ কতিপয় সমর্থক পুলিশকে ধাক্কা মেরে সশস্ত্র অবস্থায় আমিরুলের চায়ের দোকানে বসে থাকা ট্রাক প্রতীকে সমর্থকদের ওপর আক্রমণ চালায়। ট্রাক প্রতীকের সমর্থক বিল্লুর গলায় ছুরি দিয়ে পোচ দেয় ও মাথায় রাম দা দিয়ে কোপ মারে। সাথে সাথে সেখানে থাকা ট্রাক প্রতীকের অপর কয়েকজন সমর্থক নৌকা প্রতীকের সমর্থকদের ওপর লাঠি নিয়ে হামলা করে ও আহত করে। তাদের এ কর্মকাণ্ড ফৌজদারি অপরাধ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর অনুচ্ছেদ ৭৭(১) (ক) ও (খ) ও সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮ এর বিধি ১১ (গ) (ঙ) এর সুস্পষ্ট লংঘন।

এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে থানায় দুটি নিয়মিত মামলা হয়েছে মর্মে পুলিশের পক্ষ হতে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আব্দুল হাই যে অভিযোগ দিয়েছেন তাতে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থীর ব্যক্তিগত চরিত্র হনন করে বক্তব্য প্রদান করেছেন যা সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮ এর বিধি ১১ (ক) এর সুস্পষ্ট লংঘন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও আচরণ বিধিমালার বর্ণিত বিধান লংঘন করায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরসহ যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হলো।

প্রসঙ্গত, ২৪ ডিসেম্বর নৌকার প্রার্থী আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে পৃথক দুটি মামলা করেন শৈলকুপা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তায়জুল ইসলাম। এর আগে নির্বাচন কমিশন (ইসি) চিঠি পাঠিয়ে প্রার্থী আব্দুল হাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করতে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। একটি মামলায় তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। আব্দুল হাই ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন- শৈলকুপা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম ও সারুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান মামুন। অন্য মামলায় শুধু আব্দুল হাইকে আসামি করা হয়।