বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি ২৬ অক্টোবর, ২০১৯ ০২:৪৬

৩ মিনিটেই স্ট্যাটাস-ভিডিও সরাতে পারবে সরকার

ডেস্ক রিপোর্ট।। 

উচ্চ প্রযুক্তির সিস্টেম ব্যবহার করে বাংলাদেশ সরকার অনলাইন কন্টেন্ট এবং ফেসবুকের উপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৫৯ কোটি টাকায় ইনস্টল করা এই প্রযুক্তির সাহায্যে ফেসবুক পেজ, অ্যাকাউন্টসহ অনলাইনের যেকোন কন্টেন্ট মাত্র তিন মিনিটের মধ্যেই ব্লক করে দিতে পারবে সরকার। 

টেলিযোগাযোগ বিভাগের সাইবার হুমকি সনাক্তকরণ এবং প্রতিরোধ প্রকল্পের আওতায় ২০১৭ সালের জুনে এই সিস্টেম ইনস্টল করা হয়েছিল। এই সিস্টেমের সাহায্যে এপর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার সাইট ব্লক করে দেয় সরকার।  এদের বেশিরভাগই পর্ণ এবং জুয়ার সাইট ছিল।

তবে এখন পর্যন্ত সরকার কতগুলো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট কিংবা কন্টেন্ট ব্লক করেছে সে ব্যাপারে কিছুই জানা যায়নি।

বুধবার টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ফেসবুক পেজ অথবা অ্যাকাউন্টসহ যেকোন অনলাইন কন্টেন্ট ব্লক করে দেয়ার সক্ষমতা এই সিস্টেমের রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এই সিস্টেম ব্যবহার করে অনলাইন কন্টেন্ট ব্লক করতে মাত্র তিন মিনিট সময় লাগে।’  তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে এই সিস্টেম পুরোদমে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং চলতি বছরের ডিসেম্বরে এটি নিয়ন্ত্রণ করার কর্তৃত্ব বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

সরকারী সংস্থাগুলোর নির্দেশনা অনুযায়ী টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন এই সিস্টেম পরিচালনা করবে।

এই সিস্টেমটির প্রতি সেকেন্ডে ২ হাজার ৭০০ গিগাবাইট ডাটা নিরীক্ষণ করার ক্ষমতা রয়েছে। অথচ দেশের অনলাইন ব্যবহার প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ হাজার ২০০ গিগাবাইটে পৌঁছেছে।

এদিকে সম্প্রতি বাংলাদেশে অনেকের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেয়া হয়েছে, বিশেষ করে যারা সরকারের বিভিন্ন নীতিমালা নিয়ে সমালোচনা করে থাকেন। উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট নুরুল হক নূরের কথা বলা যেতে পারে।  বুধবার তিনি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারেননি। সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক সমালোচনা করেছেন তিনি।

নূর জানান, সরকারি সংস্থা কিংবা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কর্মীরা তার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে থাকতে পারে। 
এছাড়া নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবির, সাপ্তাহিক এর সম্পাদক গোলাম মোর্তুজা, চ্যানেল আই সাংবাদিক জিল্লুর রহমান, বাংলাদেশ লেখক ঐক্য পরিষদের সাবেক সভাপতি রাখাল রাহা, অ্যাক্টিভিস্ট ইমতিয়াজ মির্জা এবং রিফাত খানের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট সম্প্রতি ব্লক করে দেয়া হয়েছে।

বর্তমানে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং সরকারের সমালোচকরা নিজেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট যে কোন মুহূর্তে  ব্লক হয়ে যাওয়ার ভয়ে আছেন।

ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্লক হয়ে যেতে পারে এই ভীতি থেকে ১৭ অক্টোবর লেখক এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য নিজের এক ফেসবুক পোস্টে বন্ধু এবং অনুসারীদের তার ব্যক্তিগত ডোমেইন অনুসরণ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

এদিকে এই সিস্টেমের সক্ষমতা নিয়ে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বুধবার জানান, এই সিস্টেম ব্যবহার করে জাতীয় নিরাপত্তা, জুয়া এবং পর্ণগ্রাফির মত বিষয়গুলো দেখা হয়।

তিনি বলেন, ‘এই তিন ধরনের বিষয় ছাড়া আমরা অন্য ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করি না।’

ফেসবুক অ্যাকাউন্ট অথবা পেজ ব্লক করার ক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতা আছে কি না তা জানাতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, ফেসবুকের কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ করারও সুযোগ আছে কিন্তু তা করার ক্ষেত্রে কিছু পূর্বশর্ত পালন করতে হয়।

মোস্তফা জব্বার উল্লেখ করেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পরিধি এখন এতোটাই বিশাল হয়ে গেছে যে তা পর্যবেক্ষণ এবং পর্যালোচনা করা বিশাল এক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় বর্তমানে সেই ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করে যাচ্ছে।

সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আপিল করার কোন সুযোগ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি জানান, ব্লক করা কন্টেন্ট খুলে দেয়ার ক্ষমতাও তাদের রয়েছে তবে সেক্ষেত্রে যার কন্টেন্ট ব্লক করা হয়েছে তাকে এই ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যাখ্যা দিতে হবে।

এই সিস্টেম ছাড়াও ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ের কাছে নির্দেশনা জারি করে অনলাইনের যেকোন কন্টেন্ট অথবা ওয়েবসাইট ব্লক করে দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে সরকারের।

এছাড়া কোন ফেসবুক পেজ অথবা অ্যাকাউন্ট ব্লক করার ইচ্ছা থাকলে সরকার ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করতে পারে। গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে তার ব্যবহারকারীদের ১৯৫ টি অ্যাকাউন্টের ব্যাপারে  ১৪৯বার অনুরোধ করেছিল। এসব অনুরোধের অর্ধেকই রক্ষা করেছিল ফেসবুক।

সূত্র জানায়, সরকারের অনুরোধে ফেসবুক যদি কারো অ্যাকাউন্ট অথবা পেজ ব্লক করে দেয় তাহলে এই ব্যাপারে সঠিক কারণ জানার ক্ষমতা কারো নেই।

এদিকে ফেসবুকের উপর কর্তৃত্ব জোরদার করার জন্য সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে অফিস খোলার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছে।

ক্রমাগত চাপের কারণে অবশেষে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে তাদের একজন প্রতিনিধি নিয়োগ করতে রাজি হয়েছে। তবে এদেশে অফিস খোলার ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত তাদের কোন আগ্রহ নেই বলে জানা গেছে। 

সেপ্টেম্বর মাসে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার গণমাধ্যমে বলেছিলেন, ‘কোন কন্টেন্ট ব্লক করার ব্যাপারে সরকারী অনুরোধে সাড়া দিতে ফেসবুক এতদিন অনিচ্ছুক ছিল। কিন্তু সম্প্রতি তারা আমাদের সাথে থাকার ব্যাপারে আগ্রহী।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের যেহেতু প্রযুক্তি রয়েছে তাই ফেসবুক কর্মকর্তারা আমাদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তদবির শুরু করেছেন।’

এদিকে বিশিষ্ট আইনজ্ঞ শাহদীন মালিক  জানান, সরকার ভোলার ঘটনার সময় এধরনের পদক্ষেপ নিতে পারতো। সেসময় ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে পুলিসের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সংঘর্ষে ৪ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হয়।  অথচ সেসময় সরকারের সেই বোধোদয় ঘটেনি।