নিজস্ব প্রতিবেদক
সারাবিশ্বেই জনপ্রিয় ও পুষ্টিকর খাবার হিসেবে পরিচিত ডিম। দেশেও রয়েছে ডিমের ব্যাপক চাহিদা। বাংলাদেশের মানুষের প্রোটিনের চাহিদার বড় একটি অংশ আসে ডিম থেকে। এজন্য দিন দিন বেড়েছে ডিমের চাহিদা। অন্যান্য নিত্যপণ্যের মতো বেড়েছে ডিমের দামও। দুই দশক আগে যে দামে এক ডজন ডিম পাওয়া যেত সেই দামে এখন এক হালি ডিমও মিলছে না। অর্থাৎ ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ডিমের দাম বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি।
নব্বই দশকের শেষের দিকে যারা বাজার করতেন তাদের কয়েকজনের কাছ থেকে জানা যায়, ১৯৯৫-১৯৯৯ সালের দিকে দেশি হাস-মুরগির ডিমের হালি ছিল ৮-১০ টাকা। তখন পোল্ট্রি মুরগির ডিম খুব একটা পাওয়া যেত না। ২০০০ সালের পরে পোল্ট্রি শিল্পের বিস্তার লাভ করতে থাকে। গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে আরও পরে। ২০০১-২০০২ সালের দিকে ফার্মের মুরগির ডিমের হালি ১২-১৪ টাকার মধ্যে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ও কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের দিকে ডিমের হালি ছিল ১২-১৪ টাকা। ডজন ৪৮-৫০ টাকা। ওই সময় দেশি হাঁস-মুরগির ডিমের হালি ছিল ১৫-১৬ টাকা। ২০০৭ সালের দিকে বার্ড ফ্লুর ধাক্কা আসে পোল্ট্রি শিল্পে। যার প্রভাব পড়ে পুরো শিল্পে। ফলে ২০১০ সালের দিকে ফার্মের মুরগির ডিমের হালি বেড়ে দাঁড়ায় ২৬-২৮ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হতো ৭৫-৮০ টাকায়। ওই সময় দেশি হাঁস ও মুরগির ডিমের হালি বিক্রি হতো ২৯-৩০ টাকায়। ২০১৫ সালের দিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে ৩৪ টাকা হালি। তবে মাঝের বছরগুলোতে দাম কিছুটা ওঠা-নামার মধ্যে থাকে।
২০২০ সালে করোনাকালে গড় দাম দাঁড়ায় ৩৫-৩৬ টাকায়। ২০২১ সালেও প্রায় একই দামে বিক্রি হয়। ২০২২ সালের শুরুর দিকেও ১১০-১২০ টাকায় ডিমের ডজন বিক্রি হয়েছে। বাড়তে শুরু করে গেল বছরের মাঝামাঝি সময়ে। জুন মাসে ডিমের ডজন বিক্রি হয় ১৪০-১৪৫ টাকা। অর্থাৎ এক হালি ডিম কিনতে গুনতে হয় ৪৬-৪৮ টাকা। সম্প্রতি রেকর্ড ছুঁয়েছে ডিমের দাম। বর্তমান বাজারে প্রতি ডজন ডিম ১৫০-১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি হালি বিক্রি হচ্ছে ৫০-৫৫ টাকায়। অর্থাৎ দুই দশক আগেও যেখানে ডিমের ডজন ছিল ৩৫-৪০ টাকার মধ্যে, এখন সেই এক ডজনের দামে এক হালিও ডিম পাওয়া যাচ্ছে না।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো তিনটি নিত্যপণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। এর মধ্যে প্রতি পিস ডিমের দাম ১২ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু সেটা উপেক্ষা করেই সিন্ডিকেটের চক্রে পড়ে বাজারে ৫০-৫৫ টাকা হালিতে বিক্রি হচ্ছে ডিম। বড় বাজারগুলোতে ১৫৫-১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রতি ডজন ডিম। মহল্লার মুদি দোকানগুলো দাম আরও বেশি। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেও তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। গত ১৪ অক্টোবর বাজারে কারসাজির মাধ্যমে ডিম, মুরগি ও পোল্ট্রি ফিডের মূল্য বাড়ানোর অভিযোগে কাজী ফার্মস ও সাগুনা ফুড অ্যান্ড ফিডসকে মোট আট কোটি ৪৪ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২ এর ধারা ১৫ লঙ্ঘনের অপরাধে কাজী ফার্মসকে পাঁচ কোটি এবং সাগুনাকে তিন কোটি ৪৪ লাখ টাকা জরিমানা করে কমিশন।
ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আনতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথম দফায় চার কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর আরও দুই দফা ১০ কোটি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। তিন দফায় মোট ১৫ কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত আমদানি করা কোনো ডিম দেশে আসেনি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিম আমদানিতে ৩৩ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। এতে প্রতিটি ডিমের আমদানি খরচ ১০ টাকার বেশি পড়ে। আমদানির অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো গত মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সরকারের কাছে ডিমের আমদানি ব্যয় তুলে ধরে।
নব্বই দশকের শেষের দিকে যারা বাজার করতেন তাদের কয়েকজনের কাছ থেকে জানা যায়, ১৯৯৫-১৯৯৯ সালের দিকে দেশি হাস-মুরগির ডিমের হালি ছিল ৮-১০ টাকা। তখন পোল্ট্রি মুরগির ডিম খুব একটা পাওয়া যেত না। ২০০০ সালের পরে পোল্ট্রি শিল্পের বিস্তার লাভ করতে থাকে। গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে আরও পরে। ২০০১-২০০২ সালের দিকে ফার্মের মুরগির ডিমের হালি ১২-১৪ টাকার মধ্যে।
এদিকে পোল্ট্রি খামার মালিকরা বলছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জনসাধরণের অন্যতম নিত্যপণ্যের মধ্যে ডিম ও মুরগির মাংসের খুচরা দাম নিয়ে অসন্তুষ্টি বৃদ্ধি পাচ্ছে। পক্ষান্তরে খামারিরা তাদের উৎপাদন মূল্য না পাওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই বন্ধ হচ্ছে কোনো না কোনো পোল্ট্রি খামার। খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন জানিয়ে, দেশে বিদ্যমান এক লাখ ৫৮ হাজার ১৭৯টি খামারের মধ্যে চালু আছে ৯৫ হাজার ৫২৩টি খামার। ডিম উৎপাদনের সক্ষমতা দৈনিক যেখানে ছয় কোটি ৬৪ লাখ ৮২ হাজার ১৮৩টি, সেখানে দৈনিক উৎপাদন হচ্ছে চার কোটি ৩২ লাখ ১৩ হাজার ৪১৮টি ডিম। যা উৎপাদন সক্ষমতা থেকে ২৫ ভাগ কম।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব খোন্দকার মো. মহসিন বলেন, ‘আমাদের মুরগির অনেক খাবারই আমদানিনির্ভর। আমরা বিভিন্নভাবে সরকারকে বেশ কিছু বিষয় জানিয়েছি। কয়েক মাস আগে আমরা সংবাদ সম্মেলন করেছি। তার আগেও আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করেছি। ইতোমধ্যে ৩৯ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আমাদের অতি প্রয়োজনীয় যেসব জিনিস আমদানি করতে হয়, ডলার সংকটের কারণে তা আমদানি করতে পারছি না। যা চাহিদা দেওয়া হয় তার থেকে অনেক কম ডলার পাচ্ছি আমরা। আবার ডলারের দাম লাগামছাড়া। প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান আমদানির জন্য চাহিদা মতো এলসি ওপেন করতে না পারলে একে একে বন্ধ হচ্ছে ছোট-বড় আরও পোল্ট্রি খামারসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। ফলে সবকিছুর একটা প্রভাব এই শিল্পের ওপর পড়ছে। এই বিষয়গুলো আমরা সরকারকে জানানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু সাড়া পাইনি।’
ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আনতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথম দফায় চার কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর আরও দুই দফা ১০ কোটি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। তিন দফায় মোট ১৫ কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত আমদানি করা কোনো ডিম দেশে আসেনি।
অপরদিকে শুধু ডিম নয়, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে অসাধু সিন্ডিকেট চক্র। এ বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি নাজের হোসেইন বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই ডিমের সর্বোচ্চ দাম। অসাধু চক্র এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এই পরিস্থিতি তো হঠাৎ করে হয়নি। এখানে কারসাজি আছে। আমরা অনেক দিন ধরেই সরকারকে বলে আসছি। এসব এখন সরকারের জন্যই বিষফোঁড়া হয়ে গেছে।’


















