তানজিলুর রহমান: গত কিছুদিন ধরে খুলনায় গণসমাবেশ ঘিরে বিএনপির হেভিওয়েট নেতাদের বক্তব্যে রাজনীতির মাঠ গরম হয়ে উঠেছে। শত বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে যে কোনো মূল্যে খুলনায় গণসমাবেশ সফল করতে অটল দলটি। বিএনপির নেতারা বলছেন শান্তিপূর্ণভাবে তারা এই সমাবেশ করতে চায়।
তবে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের আগের দিন খুলনা নগরীতে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। নগরীর শিববাড়ী মোড়ে শুক্রবার বিকেল ৪টায় চলছিল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সমাবেশ। সেখান থেকে বিকেল ৫টার দিকে তারা দলীয় কার্যালয়ের দিকে বিশাল মিছিল বের করেন। ক্ষমতাসীন দলের এমন সমাবেশ-শোডাউন অন্যদিকে বিএনপির কালকের সমাবেশ উপলক্ষে নেতাকর্মীদের খুলনায় অবস্থান দুইয়ে মিলে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে নগরীতে।
সমাবেশ থেকে নেতাকর্মীরা কঠোর হুশিয়ারী ব্যক্ত করেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হারুনর রশীদ বলেন, এই দেশের যত উন্নয়ন হয়েছে আওয়ামী লীগের আমলে। উন্নয়ন করে শেখ হাসিনা, আর তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে বিএনপি। শেখ হাসিনার যদি একটা পশমের ক্ষতি হয়, তাহলে বিএনপির অস্তিত্ব থাকবে না। তিনি আরও বলেন, সারা দেশব্যাপী রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে বিএনপির মিথ্যাচার করছে। তাদের সতর্ক করে দিতে চাই, কোনো ষড়যন্ত্রে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যূত করা যাবে না। সমাবেশ থেকে আসা এমন বক্তব্য উত্তেজনার পারদকে উষ্কে দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তারা আশঙ্কা করছেন নগরীর পরিস্থিতি যে কোন মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে ।
সকাল থেকেই পরিবহন ধর্মঘট, পথে পথে তল্লাশি, হামলাসহ নানা বাধা ঠেলে খুলনায় আসছিলেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। শুক্রবার (২১ অক্টোবর) ভোর থেকে ভ্যান, রিকশা, ইজিবাইক বা হেটে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে রওনা হয়েছেন অনেকে। তবে পথে পথে আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতা–কর্মীদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ বিএনপির নেতাদের। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের প্রশ্নের সদুত্তর দিতে না পারায় ফিরেও যেতে হয়েছে অনেককে।
বাগেরহাট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, টার্মিনালে থাকা সব পরিবহনের কাউন্টার বন্ধ। বাগেরহাট থেকে খুলনাগামী বাস ছাড়াও ঢাকা-চট্টগ্রামসহ অভ্যন্তরীণ রুটের কোনো বাসই চলছে না। বাস টার্মিনালসহ আশপাশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীদের লাঠি হাতে টহল দিতে দেখা গেছে। এ ছাড়া সদর উপজেলার বারাকপুর ও যাত্রাপুর এলাকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। এর মধ্যেও চিকিৎসা, পরীক্ষা, চাকরিসহ নানা কারণের কথা বলে বিএনপি নেতা-কর্মীরা পার পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
শুক্রবার (২১ অক্টোবর) জুমার নামাজের কিছু আগে শহরের দশানী এলাকায় হাতে কাপড়ের ব্যাগ ও লুঙ্গি পরে হেঁটে যেতে দেখা যায় দুই ব্যক্তিকে। কথায় কথায় তারা জানান- কচুয়া উপজেলা থেকে এসেছেন তারা। পথে দুই স্থানে বাধার মুখে পড়েছেন। রাজমিস্ত্রির কাজে যাচ্ছেন বলে পার পেয়েছেন। আসলে কোথায় যাচ্ছেন- জানতে চাইলে প্রথমে কাজের কথা বললেও কিছুক্ষণ পর বলেন-‘সমাবেশে যাব’। এই বলেই হাঁটতে শুরু করেন তারা।
একই চিত্র দেখা গেল যশোরে। সকাল থেকে খুলনাগামী যাত্রীবাহী সব ধরনের পরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে শত শত সাধারণ মানুষ খুলনা যাওয়ার উদ্দেশ্যে যশোর বাস টার্মিনালে এসে আটকে পড়ছেন। পরিবহন শ্রমিকেরা বলছেন, কাল শনিবার খুলনায় বিএনপির গণসমাবেশ থাকায় যশোর থেকে খুলনাগামী বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। কী কারণে বাস চালানো বন্ধ রয়েছে, তা তাঁরা বলতে পারেন না।
যশোর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব সৈয়দ সাবেরুল হক বলেন, যশোরের কোনো বাস বা মাইক্রোবাস বিএনপির নেতা-কর্মীদের কাছে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে না। পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের অনেকে তাদের বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। জানতে চাইলে আন্তজেলা বাস সিন্ডিকেট যশোরের সাধারণ সম্পাদক পবিত্র কাপুড়িয়া বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আমরা নিজেরাই বিএনপিকে বাস ভাড়া দিচ্ছি না। একই কারণে খুলনা রুটে বাস চলাচলও বন্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে খুলনা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোজাফফর রহমান আলম বলেন, একদিকে গণপরিবহন বন্ধ রেখেছে, অপরদিকে পথে পথে আমাদের নেতা-কর্মীদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কোনো বাধাতেই আমাদের কর্মীদের দমিয়ে রাখা যাবে না। যে কোনো মূল্যে গণসমাবেশ সফল করা হবে।
তবে কোথাও কাউকে বাধা দেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ভূইয়া হেমায়েত উদ্দীন বলেন, কোথাও কাউকে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
সড়কে যান চলাচলে বাধা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাগেরহাট জেলা পুলিশের মিডিয়া সেলের সমন্বয়ক পুলিশ পরিদর্শক এসএম আশরাফুল আলম বলেন, সড়কে কোথাও যান চলাচলে বাধা দেওয়া হচ্ছে- এমন তথ্য পুলিশের কাছে নেই।
উল্লেখ্য, শনিবার (২২ অক্টোবর) খুলনা মহানগরীর সোনালী ব্যাংক চত্বরে বিভাগীয় গণসমাবেশের ডাক দিয়েছে বিএনপি। সমাবেশকে কেন্দ্র করে খুলনা জেলা বাসমালিক সমিতির পক্ষ থেকে ২১ ও ২২ অক্টোবর বাস চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। তবে মালিক সমিতির দাবি- সড়ক ও মহাসড়কে অবৈধভাবে নছিমন, করিমন, মাহেন্দ্র, ইজিবাইক ও বিআরটিসির গাড়ি চলাচল করছে। ২০ অক্টোবরের মধ্যে এসব অবৈধ যান চলাচল ও কাউন্টার বন্ধ না হওয়ায় ২১ ও ২২ অক্টোবর পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে।
আমাদের কাগজ/টিআর






















