নিজস্ব প্রতিবেদক: দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে যারা পিঠটান দিয়েছিলেন, তাদের বড় অংশই এবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসার চেষ্টা চালাচ্ছেন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে জায়গা পেতে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণ পর্যায়সহ দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন পদপ্রত্যাশীরা।
সম্মেলন সামনে রেখে মাঠের রাজনীতিতে তৎপরতা দেখাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মধুর ক্যানটিন এখন সরগরম। ঢাকার ধানমন্ডিতে আওয়ামী সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের ভিড় বাড়ছে, যা দেখে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের শুক্রবার বিরক্তি প্রকাশ করে বক্তব্য রেখেছেন। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের দলীয় কার্যালয়, বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রসহ রাজনৈতিক আড্ডাস্থল এবং রাজনৈতিক নেতাদের ড্রয়িংরুমেও চলছে কমিটি গঠন নিয়ে নানামুখী আলোচনা ও চেষ্টা-তদবির। পদপ্রত্যাশীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ব্যানার-পোস্টার, মিছিল-সমাবেশে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন।
ছাত্রলীগের ৩০তম জাতীয় সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল আগামী ৩ ডিসেম্বর। সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রধান অতিথি হিসেবে থাকার কথা রয়েছে। কিন্তু ওই সময় তিনি রাষ্ট্রীয় সফরে থাকবেন বলে ৮ ডিসেম্বর সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছেন। ছাত্রলীগের সর্বশেষ ২৯তম জাতীয় সম্মেলন হয় ২০১৮ সালের ১১ ও ১২ মে।
সম্মেলন নিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, ‘সুন্দর ও সফলভাবেই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। যারা যোগ্য ও ত্যাগী তাদের মূল্যায়ন করা হবে।’
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন ২০১৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই তুলনায় ২০১৮ সালের পরিস্থিতি অনেক স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এবারের শীর্ষ পদপ্রত্যাশীদের অধিকাংশ নেতা ২০১৪ সালের পর রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ভোটের আগে রাজনৈতিক পরিস্থিতি টালমাটাল থাকায় তখন অনেকেই ছাত্রলীগে পদ নিতে চাননি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও হল ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ছাত্রলীগ সবচেয়ে বেশি কর্মীসংকটে পড়ে। সে সময় বিএনপির হরতাল-অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের ফলে দেশজুড়ে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়। তখন প্রতিদিনই বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকা ককটেল ও পেট্রলবোমার শব্দে কেঁপে উঠত। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাও ক্যাম্পাসে সতর্ক অবস্থান নিতেন। কিন্তু এখনকার তুলনায় তখন নেতা-কর্মীর সংখ্যা ও অংশগ্রহণ ছিল বেশ কম। তখন বিশ্ববিদ্যালয় ও হল কমিটি করতে গিয়েও কর্মীসংকটে পড়তে হয়। এখনকার জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই সে সময় পদ নিতে চাননি। অনেকে পদ যাতে না নিতে হয়, সে জন্য গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে অধিকাংশ আবাসিক হলে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা যায়নি।
ভোটের আগে ২০১৩ সালের এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটিগুলো করা হয়। কিন্তু কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ ছিল না।
তৎকালীন হল নেতারা জানান, নির্বাচনের আগে ১৮টি হলের মধ্যে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, কবি জসীমউদ্দীন হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, অমর একুশে হল ও মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয়া হয়েছিল। বাকি হলগুলোতে নেতা-কর্মী সংকটে কমিটি দেয়া যায়নি। ওই সময় কর্মীদের অনেকের ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না। ফলে হল কমিটিগুলোতে কেউ পদ নিতে চাননি। আওয়ামী লীগ ফের ক্ষমতায় এলে কর্মীসংকটে থাকা হলগুলোই তখন নেতা তৈরির ‘কারখানা’ হয়। গঠনতন্ত্রে ৫১ সদস্যের কমিটি দেয়ার নিয়ম থাকলেও তা করা হয় ১৫১ সদস্যের। কোনো কোনো হলে আরও বেশি করা হয়।
জসীমউদ্দীন হল ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি মেহেদী হাসান রনি বলেন, ‘অনেকেই পদ নিতে চায়নি সে সময়। অনেকে রাজনীতি করবে না বলে জানিয়েছিল। অনেকেই হল ছেড়ে সে সময় বাড়িতে চলে যায়।’
ওই সময় ছাত্রলীগে সক্রিয় থাকা বেশ কয়েকজন নেতা এবার দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসার আলোচনায় আছেন। এদের মধ্যে আছেন ছাত্রলীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি সৈয়দ আরিফ হোসেন (জসীমউদ্দীন হল), যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান আল ইমরান (মুহসীন হল), তাহসান আহমেদ রাসেল (এস এম হল), প্রশিক্ষণ সম্পাদক হায়দার মোহাম্মদ জিতু (জসীমউদ্দীন হল), মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপস (এস এম হল), আইন সম্পাদক ফুয়াদ হাসান শাহাদাত (এস এম হল), উপ-আইন সম্পাদক শাহেদ খান (জসীমউদ্দীন হল), উপ-তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক এহসান উল্লাহ পিয়াল (একুশে হল) প্রমুখ।
ভোটের আগে ২০১৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান মোল্লা বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বিএনপির হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচির কারণে সারা দেশে অচলাবস্থা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রদল অচলাবস্থা তৈরি করতে চেয়েছিল। আমরা মাঠে ছিলাম। তখন কমিটি করা কঠিন ছিল। কর্মীসংকটও ছিল। সে কারণে হলগুলোতে আংশিক কমিটি করতে হয়েছিল।’
ছাত্রলীগে শীর্ষ পদপ্রত্যাশী নেতাদের সংখ্যা অন্যবারের তুলনায় এবার বেশি। চার বছরের বেশি সময় ধরে কমিটি না হওয়ায় অনেকেরই বয়স শেষের দিকে। সম্মেলনের আগে অনেকের বয়সসীমা শেষ হয়ে যাবে- এমন শঙ্কা থাকায় দৌড়ঝাঁপ বেড়েছে। গঠনতন্ত্র উল্লিখিত ২৭ বছরের বেশি বয়স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের। তবে শীর্ষ পদে তার নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া শীর্ষ পদের জন্য খুলনা অঞ্চল থেকে দৌড়ঝাঁপ করছেন বরিকুল ইসলাম বাঁধন, নাহিদ হাসান শাহিন, হাবিব আহসান। উত্তরাঞ্চল থেকে আবু হাসনাত সরদার হিমেল, আব্দুল্লাহ হীল বারী, আল আমিন সিদ্দিক সুজন ও সজীব নাথ। বৃহত্তর ফরিদপুর থেকে রাকিব হোসেন, রনি মোহাম্মদ ও শেখ স্বাধীন মোহাম্মদ শাহেদ খান।
চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে মাজহারুল ইসলাম শামীম, সাদ বিন কাদের চৌধুরী, তানবীর হাসান সৈকত, আব্দুল্লাহ আল মাসুদ লিমন ও ফয়সাল মাহমুদ। বরিশাল বিভাগ থেকে সোহানুর রহমান, শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, ইমরান জমাদ্দার ও সবুর খান কলিন্স। ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে শেখ সাঈদ আনোয়ার সিজার, এস এম রাকিব সিরাজী ও শাকের আহমেদ আল আমিন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ নেতৃত্বে আসার আলোচনায় আছেন রফিকুল ইসলাম সবুজ, শহীদুল হাসান শিশির, হাসিবুল হাসান শান্ত, জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, মেহেদী হাসান শান্ত ও রিয়াজুল ইসলাম। নারীদের মধ্যে রয়েছেন তিলোত্তমা শিকদার, ফরিদা পারভীন ও রনক জাহান রাইন।
ছাত্রলীগ দেখভালের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান বলেন, ‘সৎ, নিষ্ঠাবান, নিয়মিত ছাত্র এবং বয়সসীমার মধ্যে যারা রয়েছে তারাই কমিটিতে অগ্রাধিকার পাবে। এ ছাড়া ছাত্রদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বেশি থাকা নেতা-কর্মীদের নেত্রী বিবেচনা করবেন। ছাত্রলীগে তাদের অবদানও বিবেচনায় নেবেন তিনি।’
আমাদের কাগজ/টিআর




















