সারাদেশ ৬ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৬:৫৭

টিকা প্রয়োগ প্রস্তুতিতে অগ্রগতি নেই বাংলাদেশের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন ক্রয়, পরিবহন, বিপণন, সংরক্ষণ প্রয়োগ প্রস্তুতিতে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্য দেশ, এমনকি প্রতিবেশী ভারতও নিয়ে প্রস্তুতি প্রায় শেষ করে ফেলেছে অথচ বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য এখনো স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ প্রক্রিয়াই শুরু করতে পারেনি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা ঠিক করা হলেও প্রশিক্ষণ এখনো শুরু হয়নি টিকা প্রয়োগের জন্য কেনা হয়নি অটো ডিজেবল (এডি) সিরিঞ্জ টিকা পরিবহনের জন্য সেইফটি বক্স কোল্ড চেইন ইকুইপমেন্ট সংগ্রহের কাজও চলছে ধীরগতিতে

টকা দেশে আসার পর কোথায় সংরক্ষণ করা হবে তাও এখনো নির্ধারিত হয়নি বলা হচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই পরিচালিত কার্যক্রমের আওতায় করোনার টিকা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে জন্য অবশ্য জেলা-উপজেলা শহরের ইপিআই কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে কিন্তু তারা কীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করবেন, এর জন্য কী ধরনের প্রস্তুতির প্রয়োজন হবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো কিছুই জানানো হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ফাইজারের উৎপাদিত টিকা বাংলাদেশের মতো দেশে অন্তত মাইনাস ৭০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে

জন্য গড়ে তুলতে হবে কোল্ড চেইন ইকুইপমেন্ট ব্যবস্থাপনা এদিকে করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রথম ধাপে টিকা পেতে বাংলাদেশ জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে জন্য সরকার ইতিমধ্যে ভারতীয় একটি কোম্পানির সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তিও করেছে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড এবং বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সঙ্গে সরকার সমঝোতা স্মারক সই করেছে নভেম্বর সমঝোতা অনুযায়ী সিরাম ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসকে অক্সফোর্ডের তৈরি সার্স-কভ- এজেডডি ১২২২ (অক্সফোর্ড/অ্যাস্ট্রাজেনিকা ভ্যাকসিন) সরবরাহ করবে ছাড়া আরেক ওষুধ কোম্পানি ইনসেপ্টার সঙ্গে এরই মধ্যে চীনের সিনোভ্যাক কোম্পানির সমঝোতা হয়েছে বাংলাদেশে তাদের টিকা উৎপাদনের জন্য ভারতের বায়োটেক সানোফির টিকার ট্রায়ালের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেকের টিকার ট্রায়ালের দায়িত্ব নিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)

এদিকে অর্থ বিভাগ থেকে ১৬ নভেম্বর ভ্যাকসিন কিনতে ৬৩৫ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে বুধবার জরুরি প্রয়োজনের ভিত্তিতে কোনো দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ভ্যাকসিন কেনার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এরপর সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার কমিটির অনুমোদনের প্রয়োজন হবে হয়তো চলতি সপ্তাহে ক্রয় কমিটিতে এটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে

জানা গেছে, করোনা মহামারী মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ফাইজার জার্মানির কোম্পানি বায়োএনটেকের যৌথভাবে তৈরি টিকায় আশার আলো দেখতে শুরু করেছে বিশ্ব প্রাণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসার্থে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে দুটি কোম্পানির তৈরি টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাজ্য চলতি সপ্তাহ থেকেই দেশটি স্বাস্থ্যকর্মী বয়স্কসহ অতি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে টিকার প্রয়োগ শুরু করতে যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে শুধু যুক্তরাজ্যসহ নয়, যুক্তরাষ্ট্রও নিয়ন্ত্রক সংস্থা খাদ্য ওষুধ প্রশাসন এফডিএর অনুমোদন সাপেক্ষে চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে টিকার প্রয়োগ শুরু করতে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে
 

এখানে শুধু যুক্তরাজ্যই নয়, এবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল ইইএর অন্য দেশগুলোও ফাইজার বায়োএনটেক এবং মডার্নার টিকার অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে ফাইজার বায়োএনটেকের টিকার ব্যাপারে ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে আর মডার্নার টিকার ব্যাপারে আগামী বছর ১২ জানুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে তারা ইইউ ইইএভুক্ত ৩১টি দেশের অধিকাংশই তাদের নাগরিকদের বিনামূল্যে করোনা ভ্যাকসিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশগুলো প্রাথমিকভাবে স্বাস্থ্যকর্মী, বয়স্ক ব্যক্তি শারীরিক নানা সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বলে ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল ইসিডিসির এক জরিপে উঠে এসেছে

জানা গেছে, টিকা পেতে অনেক দেরি হওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে এত দিন টিকা প্রয়োগ প্রস্তুতি ঢিমেতালে চলছিল এরপর অক্টোবরের শেষ দিকে টিকার প্রয়োগ প্রস্তুতির ব্যাপারে নড়েচড়ে বসে সরকার চলতি ডিসেম্বরের মধ্যে টিকা পাওয়া যাবে এমন সম্ভাবনা সামনে রেখে নভেম্বরের মধ্যে প্রয়োগ প্রস্তুতি শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি এখনো প্রস্তুতির গোড়াতেই রয়ে গেছে বাংলাদেশ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদফতর, মন্ত্রণালয়, ইপিআই কর্তৃপক্ষ, ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিভাগগুলো এক হয়ে কাজ করছে

টিকার সংরক্ষণ, পরিবহন অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ক্রয় পদ্ধতি, টিকা প্রয়োগের কর্মী তাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গাইডলাইন তৈরির কাজ চলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইউনিসেফের সহায়তায় স্বাস্থ্য অধিদফতর কাজ করছে বিশেষজ্ঞরাও আছেন কাজের সঙ্গে মোট নয়টি টিমে ভাগ হয়ে চলছে কাজ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টিকাকেন্দ্রিক গাইডলাইন ধরে জন্য একটি গাইডলাইনও তৈরি করা হয়েছে প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘চলতি ডিসেম্বরের মধ্যেই কভিডের টিকা আসতে পারে সেদিকে নজর রেখেই আমরা সামগ্রিক কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছি টিকার প্রয়োগ কার্যকরের প্রস্তুতির কাজও চলছে পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্যকর্মী স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে আশা করা হচ্ছে আবিষ্কারের প্রথম ধাপেই টিকা পাবে বাংলাদেশসূত্র জানান, বর্তমানে সারা দেশে ইপিআইয়ে যারা আছেন তাদের মাধ্যমেই সরকারি ব্যবস্থাপনায় করোনাভাইরাসের টিকা প্রয়োগের পরিকল্পনা আছে অবশ্য জনবলে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে কার্যক্রমের আওতায় পদ রয়েছে ২২ হাজার আর কর্মরত আছেন ১৭ হাজার বাকি হাজারের মতো পদ শূন্য রয়েছে এত কম সময়ের মধ্যে এতসংখ্যক কর্মী নিয়োগ দেওয়াও প্রায় অসম্ভব জন্য অতিরিক্ত প্রয়োজনীয়সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ করা হবে তাদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে ইতিমধ্যে কার্যক্রমের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যানুসারে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গঠিত টিকা সমন্বয় উদ্যোগ বা কোভ্যাকসের শর্ত নীতিমালা অনুসারে বাংলাদেশ মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ টিকা কোভ্যাকস থেকে পাবে সে হিসাবে কোটি ৪০ লাখ মানুষের জন্য টিকা আসবে বাংলাদেশে দুই ডোজের টিকা হলে লাগবে কোটি ৮০ লাখ ডোজ অবশ্য এর পুরোটা এক ধাপে আসবে না একাধিক কিস্তিতে আসবে কোভ্যাকসের নির্ধারিত দাম অনুসারে প্রতি ডোজ টিকার জন্য দিতে হবে দশমিক ডলার থেকে ডলার পর্যন্ত সে হিসাবে প্রতি ডোজের দাম ডলার ধরা হয়েছে দুই ডোজের জন্য জনপ্রতি ধরা হয়েছে ডলার করে আর এর সঙ্গে পরিবহন অন্যান্য খরচ বাবদ জনপ্রতি ধরা হয়েছে ডলার করে অর্থাৎ কোভ্যাকসের টিকা প্রয়োগে মাথাপিছু খরচ ধরা হয়েছে প্রাথমিকভাবে থেকে ডলার করে তবে বেসরকারি কোনো কোম্পানির কাছ থেকে যদি সরকার টিকা কেনে, এর দাম অনেক বেশি পড়বে বেসরকারি কোম্পানিও বেসরকারি পর্যায়ে টিকা বিক্রি করলে এর দাম কয়েক গুণ বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে যদিও সরকারের তরফ থেকে দাম বেঁধে দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে অবশ্য স্বাস্থ্য অধিদফতর হিসাব-নিকাশ করে এখন পর্যন্ত প্রতি জনের কাছে ডলারে ভ্যাকসিন বিক্রির প্রাথমিক সিদ্ধান্তও নিয়ে রেখেছে মন্ত্রণালয়সূত্র জানান, মডার্না ফাইজারের সঙ্গে দেশের একাধিক ওষুধ কোম্পানির যোগাযোগ রয়েছে ওই দুই কোম্পানি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর বিষয়টি মাথায় রেখে তাদের টিকা সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গেই কোল্ড চেইন ব্যবস্থা যুক্ত করার চিন্তা করছে বলে সরকারকে জানানো হয়েছে অর্থাৎ যে দেশে ওই টিকা যাবে সে দেশে ওই কোম্পানি নিজেরাই কোল্ড চেইনের দায়িত্ব পালন করবে এটা করা হলে বাংলাদেশের মতো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য বেশ সুবিধাই হবে অন্যথায় কোল্ড চেইন মেইনটেইন করে টিকা বিপণন, পরিবহন, প্রয়োগ করা বাংলাদেশের জন্য হবে কঠিন চ্যালেঞ্জ কেননা তেমন উন্নত অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি আর সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে এর জন্য উন্নত প্রস্তুতি সম্পন্ন করাও হবে বেশ কঠিন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিটি দেশের অবকাঠামো প্রয়োজনীয়তা বুঝতে বিশ্বজুড়ে সরকারগুলোর সঙ্গে কাজ করছে সংস্থাটি দেশগুলোকে লজিস্টিক্যাল সাপোর্ট দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফাইজার বলছে, ‘ভারতে আমাদের টিকার ব্যবহার শুরুর ব্যাপারে আমরা আশাবাদীফাইজারের করোনা ভ্যাকসিন মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে আর বিষয়টি অবকাঠামো বিবেচনায় ভারত বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তা দিয়েছেন