আমাদের কাগজ রিপোর্ট: আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। এরপর রাজধানীর পাশে দেশের সবচেয়ে বড় সিটি করপোরেশন গাজীপুরে ভোট। গত কিছুদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এ নির্বাচন। আর হবেই বা না কেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে এ নির্বাচন অনেক হিসেব ও গুরুত্ব বহন করছে।
বৃহস্পতিবার (২৫ মে) প্রায় ১২ লাখ ভোটার গাজীপুর সিটির তৃতীয় নগরপিতা নির্বাচিত করবেন। ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে ভোটের প্রচার-প্রসার। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে নির্বাচন কমিশন। ৪৮০টি কেন্দ্রের সবগুলোতে ইভিএমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
গাজীপুরে শেষ হাসি কে হাসবেন- সেই আলোচনা শুরু হয়েছে সবখানে। মেয়র পদে আটজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল আলোচনায় রয়েছেন দুইজন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমত উল্লা খান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুনের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দলীয় প্রভাব, অভিজ্ঞ রাজনীতিক, টঙ্গী পৌরসভার টানা ১৮ বছরের চেয়ারম্যান হিসেবে আজমত উল্লা খান অনেকটাই এগিয়ে আছেন। ক্লিন ইমেজের মানুষ হিসেবেও তিনি পরিচিত। সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নগরবাসী তাকেই বাছাই করে নিতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। গাজীপুর আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি, সে হিসেবে এখানে নৌকা বিজয়ী হবে বলেই আশা ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের।
তবে আজমত উল্লার জয় যে সহজ হবে না সেটা বলছেন তার নিজ দলের নেতাকর্মীরাও। কারণ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে সরব রয়েছেন সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম। নিজে প্রার্থী হতে না পেরে শেষ পর্যন্ত মাকে প্রার্থী করেছেন তিনি। তবে বাহ্যত মাকে প্রার্থী করলেও মূলত ভোটের মাঠে জাহাঙ্গীর আলমকেই বিবেচনা করছেন নগরবাসীর একাংশ। গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদকের ওপর অবিচার করা হয়েছে এমন দাবি তার ভক্ত-অনুরাগীদের। তারা বলছেন, এই অবিচারের জবাব জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে দেবে।
এছাড়া জাহাঙ্গীর আলমের ভালো জনপ্রিয়তা রয়েছে গাজীপুরে। তিনি সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান এবং গাজীপুরের মেয়র ছিলেন। এ হিসেবে যারা জাহাঙ্গীর আলমকে পছন্দ করেন তারা এবার তার মাকে বাছাই করতে পারেন। জাহাঙ্গীর সমর্থকদের দাবি, সুষ্ঠু ভোট হলে জায়েদা খাতুন বিজয়ী হবেন। কারণ সরকারবিরোধী ভোট জায়েদা খাতুনের বাক্সেই যাবে।

মেয়র পদে জাতীয় পার্টির হয়ে লাঙ্গল প্রতীকে লড়ছেন এমএম নিয়াজ উদ্দিন। গাজীপুরে জাতীয় পার্টির তেমন ভোটব্যাংক না থাকলেও সাবেক এই সচিবের ব্যক্তি ইমেজ রয়েছে। সেটার প্রভাব ভোটের বাক্সে পড়তে পারে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন সরকার শাহনুর ইসলাম। তিনি বিএনপি পরিবারের সদস্য। তার চাচা হাসান উদ্দিন সরকার গত নির্বাচনে জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার বাবা বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকার আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন। বিএনপি ভোট বর্জন করলেও সাধারণ ভোটারদের একটা সমর্থন শাহনুর পেতে পারেন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। এছাড়া টঙ্গীতে সরকার পরিবারের বেশ প্রভাব রয়েছে। ভোটের বাক্সে এর প্রতিফলন ঘটতে পারে।
মেয়র পদে আলোচনায় রয়েছেন আরেক প্রার্থী গাজী আতাউর রহমান। তিনি চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে হাতপাখা প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। গত কয়েক বছর ধরে এই ইসলামি দলের ভোট উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। গাজীপুর সিটি নির্বাচনেও তারা ভালো করতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ফ্যাক্টর নারী শ্রমিক ও নতুন ভোটার
গাজীপুর শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা। এখানকার ভোটারদের একটি বড় অংশ শ্রমিক। সবকিছু ছাপিয়ে জয় নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারেন নগরীর শ্রমিক ভোটাররা। বিশেষ করে নারী পোশাক শ্রমিকরা।
জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর সিটির মোট ভোটার ১১ লাখ ৭৯ হাজার ৪৭৬ জন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক নারী। এসব নারী ভোটারের মধ্যে অধিকাংশ পোশাক কারখানায় কর্মরত।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের পাশাপাশি নারী ও নারী শ্রমিক ভোটারদের একটি বিরাট প্রভাব থাকবে। শ্রমিক নেতাদের দাবি, গাজীপুর সিটি এলাকায় অন্তত তিন লাখ পোশাক শ্রমিক রয়েছেন যাদের অনেকে এখানে ভোটার হয়েছেন। এসব ভোটারের ৮০ শতাংশই নারী।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সহসাংগঠনিক সম্পাদক মো. শফিউল আলম বলেন, গাজীপুরে নারী ভোটারদের মধ্যে অর্ধেকই শ্রমিক। এসব শ্রমিক ভোটের মাঠে বিরাট প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনে নারী শ্রমিকেরা যার পক্ষে থাকবেন, তিনি জয়লাভ করবেন। যিনি শ্রমিকদের ভালো-মন্দ দেখার কথা দেবেন, তাদের চলাফেরায় নিরাপত্তা ও সুযোগ সুবিধা দেখবেন তাকেই তারা ভোট দেবে।
গাজীপুর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আনোয়ার সাদাত সরকার বলেন, এখানে নারী ভোটার রয়েছেন প্রায় ছয় লাখ। যাদের বেশির ভাগই নারী শ্রমিক। যিনি শ্রমিকবান্ধব, নারী বান্ধব প্রার্থী হবেন, পোশাক শ্রমিকেরা তাকেই বেছে নেবেন।
এছাড়া এবারের নির্বাচনে নতুন ভোটার, শ্রমিক, বস্তিবাসী, আঞ্চলিক ভোটার, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের সমর্থন, উন্নয়নবঞ্চিত ভোটার, জাতীয় নির্বাচন, কাউন্সিলর প্রার্থীদের তৎপরতা ও সংখ্যালঘু ভোটের হিসাব-নিকাশ জয়-পরাজয় নির্ধারণ করতে পারে।
রিটার্নিং কার্যালয়ের তথ্য মতে, এবার গাজীপুর সিটিতে নতুন ভোটার বেড়েছে প্রায় ৫০ হাজার। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং পোশাক কারখানার শ্রমিক। ফলে জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে নতুন ভোটাররা বড় ফ্যাক্টর হবেন।
নগরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার ভোটার হতে পেরে তারা দারুণ উচ্ছ্বসিত। তারা জানান, যিনি জনগণের ভালো করবেন, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, জলবদ্ধতা ও যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখবেন, তাকেই তারা ভোট দেবেন।
আমাদের কাগজ/টিআর




















