রাজবাড়ী প্রতিনিধি
রাজবাড়ী সদরে একটি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) দুই সদস্যকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মারধরের তথ্য পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার বসন্তপুর ইউনিয়নের মহারাজপুর বাজারের একটি দোকানে তাদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালানো হয়। তবে গত শুক্রবার রাতে এ-সংক্রান্ত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ ঘটনার জন্য স্থানীয় লোকজন ইউনিয়ন যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক রায়হান খানকে দায়ী করেছেন। বিষয়টি জানাজানি হলে জেলা যুবদল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বসন্তপুর ইউপির সংরক্ষিত (নারী) ওয়ার্ডের এক সদস্য ও সাধারণ ওয়ার্ডের এক সদস্য বৃহস্পতিবার রাতে স্থানীয় কয়েকটি দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনে যান। গভীর রাত হয়ে যাওয়ায় নারী ইউপি সদস্যকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে যান পুরুষ ইউপি সদস্য। রাত সাড়ে ১২টার দিকে রায়হান খানসহ কয়েকজন তাদের আটক করেন। দু’জনের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে– এমন অপবাদ দিয়ে মহারাজপুর বাজারের একটি দোকানে নিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে। এ সময় তাদের লাঠি দিয়ে বর্বরভাবে পেটানো হয়। মারধরকারীরা নারী সদস্যের গলা থেকে স্বর্ণের চেইনও ছিনিয়ে নেয়। নির্যাতনের শিকার দু’জনকে এলাকাবাসী উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে। জানা গেছে, সেখানে চিকিৎসা নিয়ে অন্য জায়গায় আত্মগোপনে গেছেন তারা। গতকাল শনিবার দফায় দফায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন এই প্রতিনিধি।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, শুরুতে ওই দুই ইউপি সদস্যকে সাদা রঙের নাইলনের দড়ি দিয়ে পিঠমোড়া করে বাঁধা হয়। পুরুষ সদস্যকে দাঁড়িয়ে থাকতে ও নারী সদস্যকে মেঝেতে বসে থাকতে দেখা যায়। এ সময় রায়হান খান ও তার সহযোগীরা দু’জনকে লাঠি দিয়ে পর্যায়ক্রমে পেটাতে থাকেন। লাঠির আঘাতে নারী সদস্যকে ‘মা রে, বাবা রে.. ও আল্লাহ!’ বলে চিৎকার করতে শোনা যায়। এ সময় একজন পাশ থেকে নির্যাতনকারীকে পরামর্শ দেয়, ‘গিড়ায় না, মাংসতে মার।’
এ ছাড়া দু’জনকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করছিলেন যুবদল নেতা রায়হান খান। এক পর্যায়ে নির্যাতনকারীরা নারী সদস্যের গলা থেকে স্বর্ণের চেইন খুলে নেয়। এ সময় ওই নারী বলছিলেন, ‘এটি বিয়ের সময় আমার স্বামী আমাকে দিয়েছে।’ তা শুনে পাশ থেকে আরেক যুবক লাঠি হাতে তেড়ে এসে দুই ইউপি সদস্যকে আরেক দফায় মারধর করতে থাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী জানান, দুই ইউপি সদস্য যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, তা নিয়ে সালিশ বসিয়ে শাস্তি দেওয়া যেত। কিন্তু যেভাবে তাদের বেঁধে পেটানো হয়েছে, তা অমানবিক ও বর্বরোচিত। এ ঘটনার নিন্দা জানান।
যুবদলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত রায়হান খানের বাড়ি একই ইউনিয়নের মহারাজপুর গ্রামে। তিনি জিয়া সাইবার ফোর্সের সঙ্গেও যুক্ত বলে জানা গেছে। যদিও এমন তথ্য অস্বীকার করেন জিয়া সাইবার ফোর্সের ভাইস চেয়ারম্যান ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সোনিয়া আক্তার স্মৃতি। তিনি বলেন, রায়হান তাদের সংগঠনের কেউ নন। কখনও জড়িত ছিলেন না
রায়হান খানের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে তিনি বলেন, ‘কেন মেরেছি, তা এলাকায় গিয়ে জানেন।’ এরপর ‘ব্যস্ত আছি’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। বসন্তপুর ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেনের ভাষ্য, নারী ইউপি সদস্যের ঘরে পুরুষ সদস্যকে পাওয়া যায় বলে তিনি শুনেছেন। পরে সেনাবাহিনী এসেছিল। এর বেশি কিছু জানেন না। ওই দুই জনপ্রতিনিধি কোথায় আছেন, তা-ও জানেন না। এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্যও করতে রাজি হননি।
বিষয়টি জানার পর শুক্রবার রাতেই রায়হানকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজবাড়ী জেলা যুবদলের আহ্বায়ক খায়রুল আনাম বকুল। রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শরীফ আল রাজীব বলেন, ভুক্তভোগী নারী ইউপি সদস্য রাজবাড়ী সদর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে। এ ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে; কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।






















