সারাদেশ ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১১:৪৩

১০ দিনেও উদ্ধার হয়নি ২০ জেলে, সুন্দরবনে ‘কম্বিং অপারেশন’

খুলনা প্রতিনিধি
নজরদারির অভাবে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে আবারও দস্যুদের উৎপাত বেড়েছে। ইতিমধ্যে বনজীবীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের খবর পাওয়া গেছে। ধারালো অস্ত্র ও বন্দুক নিয়ে বনজীবীদের সব কেড়েও নিচ্ছে দস্যুরা। নতুন নতুন দস্যু দলকে বনের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখার কথা জানিয়েছেন বনজীবীরা। এ ছাড়া গত ১০ দিনেও উদ্ধার হয়নি অপহৃত ২০ জেলে। এ অবস্থায় দস্যু দমনে ‘কম্বিং অপারেশন’ শুরু করেছে যৌথ বাহিনী।

স্থানীয় বনজীবীরা বলছেন, সুন্দরবনে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বনদস্যুরা। আত্মসমর্পণকারী এবং নতুন দল মিলে ২০টি বাহিনী এখন সক্রিয়। জেলেদের অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ে আতঙ্ক তৈরি করছে এসব বাহিনীর সদস্যরা। সাগর ও উপকূলের জেলেরা এখন মাছ আহরণেও ভীত সন্ত্রস্ত রয়েছেন। গত এক সপ্তাহে অন্তত ৫০ জেলেকে অপহরণ করা হয়। এ সব ঘটনায় উদ্বিগ্ন জেলেরা প্রাণের ভয়ে সাগর ও নদীতে মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়েছেন। এ অঞ্চলের প্রায় ২০ হাজার জেলে ও তাদের পরিবার উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এ অবস্থায় অভিযান চালানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন তারা। 

বন বিভাগ ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দস্যুদের হাতে জিম্মি জেলেদের উদ্ধার ও দস্যু দমনে সুন্দরবনজুড়ে ‘কম্বিং অপারেশন’ শুরু করেছে যৌথ বাহিনী। মঙ্গলবার থেকে এ অভিযান শুরু হয়েছে।

২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ধাপে ধাপে সুন্দরবন অঞ্চলের ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন দস্যু ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪টি গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেছিল। পরে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর প্রাণবৈচিত্র্যে ভরা সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করেছিল তৎকালীন সরকার। দস্যুরা স্বাভাবিক জীবনে ফেরায় শান্তি ফিরে আসে বনে। নিশ্চিন্তে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন বনজীবী ও জেলেরা।

আত্মসমর্পণকারীদের অনেকে আবার দস্যুতায় ফিরেছে
২০২৪ সালের আগস্টের পর পাল্টে যেতে থাকে দৃশ্যপট। সরকার পতনের সুযোগে দুলাভাই বাহিনীসহ সুন্দরবনে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে অন্তত ২০টি দস্যুদল। তারা নিয়মিত অস্ত্রের মুখে বনজীবীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে। আত্মসমর্পণকারীদের অন্তত ১৩ জন আবার দস্যুতায় ফিরেছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্য দিয়ে দস্যুদের রাজত্বে পরিণত হয়েছে ছয় বছর শান্ত থাকা সুন্দরবন। হয়ে উঠেছে আরও ভয়ঙ্কর।

কোস্টগার্ড, জেলে, মহাজন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বনের ওপর নির্ভরশীল জেলেরা বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অপহরণের পর মারধর করাসহ মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। যা দিতে না পারায় জেলেদের ওপর চলছে নির্যাতন। এই আতঙ্কে দুবলার চরসহ উপকূলীয় এলাকার কয়েক হাজার ট্রলার ও নৌকা এখন তীরে অলস বসে আছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মঙ্গলবার থেকে সুন্দরবনের দুবলা, হারবাড়িয়া, কোকিলমনি, নন্দবারা ও জোংড়াসহ বনের বিভিন্ন গহীন খালে অভিযান শুরু করে যৌথ বাহিনী। কম্বিং অপারেশনে র‌্যাব, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও পুলিশ সমন্বিতভাবে অংশ নেয়। মঙ্গলবার দিনভর বনের বিভিন্ন পয়েন্টে তল্লাশি চালানো হয়। কিন্তু প্রথম দিনের অভিযানে কোনও অপহৃত জেলেকে উদ্ধার কিংবা দস্যুকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে অপহৃত জেলেদের উদ্ধার ও সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত না করা পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাছ ধরার শেষ মৌসুমে দস্যু আতঙ্কে জেলেরা মাছ ধরা বন্ধ রেখেছেন। এতে কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় বর্তমানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অপহৃত জেলেদের উদ্ধার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানাচ্ছি।’

বঙ্গোপসাগর থেকে অপহরণের ১০ দিন পার হলেও মুক্তি মেলেনি ২০ জেলের। এসব জেলের প্রতি জনের মুক্তিপণ হিসেবে মোবাইল ফোনে মহাজনদের কাছে সাড়ে তিন লাখ টাকা করে (৭০ লাখ) দাবি করা হয়েছে। মুক্তিপণের টাকা কমবেশি নিয়ে মহাজন-বনদস্যুদের দরকষাকষি চলছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

সুন্দরবন বিভাগ জানায়, ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার সময় ২০টি ট্রলার থেকে ২০ জেলেকে অপহরণ করে বন ও জলদস্যু জাহাঙ্গীর এবং সুমন বাহিনী। এ ঘটনার পর আতঙ্ক আর নিরাপত্তার অভাবে শরণখোলা রেঞ্জের নিয়মিত জেলেসহ শুঁটকি উৎপাদনে নিয়োজিত জেলেরা সাগর ও বনে মাছ ধরা বন্ধ করে দেন। দেশের বৃহত্তম এ শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্রে দেখা দেয় মাছ সংকট। মাছ ধরতে না পারায় লোকসানে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। আর্থিক সংকট দিশাহারা হাজার হাজার জেলে। 

দুবলা শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্রের বিশেষ টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ফরেস্ট রেঞ্জার) মিল্টন রায় জানান, ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে বনদস্যুদের দেওয়া মোবাইল নম্বরে কথা বলেছেন মহাজনরা। ট্রলার প্রতি ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেছে তারা। বনদস্যুদের সঙ্গে কথা বলে চাঁদার পরিমাণ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অপহরণকারীরা চাঁদা পরিশোধের নির্ধারিত সময়সীমা বেঁধে দেয়নি। ফলে তাদের এখনও উদ্ধার করা যায়নি।

দস্যু দমনে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বললেন প্রতিমন্ত্রী
এ বিষয়ে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও অগ্রগতি ঠিক রাখার জন্য সুন্দরবনের জলদস্যুতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বনকে দস্যুমুক্ত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেবো আমরা। একসময় সুন্দরবন অনেকটায় দস্যুমুক্ত হয়েছিল। তবে আবারও তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ফলে অনেক জেলে মাছ ধরতে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। এভাবে চললে ইকো-ট্যুরিজম ও ব্লু-ইকোনমি মুখথুবড়ে পড়বে। তাই সব বাহিনী ও বন বিভাগের সমন্বয়ে অভিযান শুরু হয়েছে।’

প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘বনজীবীরা যাতে নিরাপত্তার সঙ্গে কাজ করতে পারেন, সেজন্য দস্যু দমনে কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। আর সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।’

২০ বাহিনীর দাপট
মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসা ও বনদস্যুদের হাত থেকে উদ্ধার হওয়া জেলেদের ভাষ্যমতে, বর্তমানে সুন্দরবনে আসাবুর বাহিনী, করিম শরীফ বাহিনী, আবদুল্লাহ বাহিনী, মঞ্জুর বাহিনী, দয়াল বাহিনী, রবি বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, রাঙ্গা বাহিনী, সুমন বাহিনী, আনারুল বাহিনী, হান্নান বাহিনী, আলিফ বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী, দাদাভাই বাহিনী, ইলিয়াস বাহিনী ও মজনু বাহিনীর নাম উল্লেখযোগ্য। তাদের সঙ্গে আরও আছে চার-পাঁচ বাহিনী। একেক বাহিনীতে ১৫-২০ জন থেকে ৪০ জন সদস্য রয়েছে। এসব বাহিনীর প্রত্যেকের হাতে রয়েছে দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র। তারা গহীন বনে আস্তানা গড়ে জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে আসছে। এসব বাহিনীর মধ্যে জাহাঙ্গীর, মঞ্জুর এবং দাদাভাই বাহিনীর অস্ত্র ও সদস্য সংখ্যা বেশি এবং দুর্ধর্ষ। এই তিন বাহিনী আগে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছিল। 

২০১৬ সালে সুন্দরবনে দস্যু দমনের সূচনা হয়। যখন সবচেয়ে বড় দল ‘মাস্টার বাহিনী’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করে আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেয় এবং পুনর্বাসনে রাজি হয়। আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) একাধিক কর্মকর্তা জানান, এরপর আরও ৩২টি দস্যু বাহিনীর প্রধানসহ ৩২৮ জন দস্যু আত্মসমর্পণ করেন, জমা দেন ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪টি গুলি। অবশেষে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেছিল সরকার। 

সুন্দরবন দস্যুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে
খুলনা র‍্যাব-৬-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নিস্তার আহমেদ বলেন, ‘সুন্দরবনসহ উপকূলকে নিরাপদ করতে যৌথ বাহিনীর অভিযান জোরদার করা হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে ‘কম্বিং অপারেশন’ অভিযান শুরু হয়। সম্প্রতি দস্যুদের হাতে জেলে অপহরণ, জিম্মি ও নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ হওয়ায় এ অভিযান শুরু হয়েছে। আশা করছি, এর মধ্য দিয়ে সমুদ্র ও উপকূলে শান্তি ফিরবে। জেলেরা নিরাপদে মাছ আহরণ করতে পারবেন। জিম্মি জেলেদের উদ্ধার করে বাড়ি ফেরানো সম্ভব হবে। একইসঙ্গে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা হবে।’

কোস্টগার্ডের বিসিজিএস অপরাজেয় বাংলার নেভিগেশন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট মোল্লা মাহমুদ আল হোসাইন বলেন, ‘বনদস্যু নির্মূলে সুন্দরবনে কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। দস্যু নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত কোস্টগার্ডের এ অভিযান চলবে।’