আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ (পিটিআই) প্রধান এবং প্রাক্তন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সরকার বিরোধী লং মার্চের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় গুলিতে আহত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৩ নভেম্বর) পাঞ্জাবের ওয়াজিরাবাদে পায়ে গুলিবিদ্ধ হন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী।
পরে ইমরান খানকে উদ্ধার করে শওকত খানম হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং তিনি এখন শঙ্কামুক্ত বলে জানা গেছে। এই ঘটনায় পাকিস্তান ছাড়াও বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠেছে।
প্রকৃত পক্ষে কী হয়েছিল সেদিন?
বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ২১ মিনিটে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় পাঞ্জাবের ওয়াজিরাবাদ শহরে লংমার্চের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় ইমরান খানকে উদ্দেশ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে এবং এসময় পাকিস্তানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী তার ডান পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। তবে তার জীবন হুমকির মুখে পড়েনি। ওই হামলায় ইমরান খানসহ মোট ১৪ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এছাড়া ইমরান খানের এক সমর্থক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
এ বিষয়ে পিটিআই নেতা ফাওয়াদ চৌধুরী টুইটারে বলেছেন, ‘এই হামলা কেবল ইমরান খানের হত্যার প্রচেষ্টা নয় বরং সমগ্র পাকিস্তানের ওপরই একটি আক্রমণ।’
হামলার পর ইমরান খানকে পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। একজন চিকিৎসক বলেছেন, ইমরানের পায়ে বুলেটের টুকরো ছিল এবং তার পায়ের টিবিয়া হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর আগে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত ভিডিওগুলোতে হামলায় আহত ইমরান খানকে তার গাড়ি থেকে সরিয়ে নিতে এবং সেসময় তাকে মানুষের দিকে হাত নাড়তে দেখা গেছে।
হামলার ঘটনা কেন ঘটল?
লংমার্চের সময় দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো এক হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বৃহস্পতিবার ওয়াজিরাবাদের আল্লাহ ওয়াল্লা চকে লংমার্চে দুই হামলাকারী ইমরান খানকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। এ সময় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর গুলিতে এক হামলাকারী নিহত হন। অপর হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী।
গ্রেপ্তার হওয়া বন্দুকধারীর পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। আবার কোনো গোষ্ঠী হামলার দায়ও স্বীকার করেনি। তবে পাকিস্তানের টিভি চ্যানেলগুলোতে হামলাকারী হিসেবে একজনকে দেখানো হয়। সন্দেহভাজন ওই বন্দুকধারীর বয়স বিশ বা ত্রিশের মধ্যে। তিনি বলেন, তিনি ইমরান খানকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন এবং তিনি একাই এই কাজে অংশ নেন।
অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি দাবি করেন, ‘ইমরান খান লোকজনকে বিভ্রান্ত করছেন। আমি তাকে সহ্য করতে পারছিলাম না। যে কারণে তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম। তাকে হত্যার চেষ্টা করেছি। আমি ইমরান খানকে হত্যার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছি। আমি কেবল ইমরান খানকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম। এছাড়া আমার আর কাউকে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল না।’
হামলাকারী এই যুবক বলেন, ইমরান খান লাহোর ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে হত্যার পরিকল্পনা করছিলেন তিনি। তবে এই হামলায় তার কোনও সহযোগী আছে কিনা জানতে চাইলে মাথা নাড়িয়ে নেতিবাচক জবাব দেন হামলাকারী। তিনি বলেন, ‘আমার সাথে আর কেউ ছিল না। আমি একাই ছিলাম।’
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন, অভিযুক্ত হামলাকারীর স্বীকারোক্তিমূলক এই ফুটেজটি পুলিশ রেকর্ড করেছে।
হামলার বিস্তৃত প্রেক্ষাপট কী?
চলতি বছরের এপ্রিলে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরানের খানের সরকারকে অপসারণ করা হয়। এরপর থেকে আগাম নির্বাচনের দাবিতে সারাদেশে জনসভা করে আসছেন বিশ্বকাপজয়ী সাবেক এই তারকা ক্রিকেটার।
সরকারবিরোধী এসব সমাবেশে তিনি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়েছেন বলে অভিযোগ করে আসছিলেন ইমরান খান। এ নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে উত্তাপ বিরাজ করছে।
মূলত, আগামী বছরের অক্টোবরে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের আগেই আগাম নির্বাচনের দাবিতে দেশজুড়ে সমাবেশ করছেন ইমরান খান। তার এসব সমাবেশ ঘিরে দেশটিতে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে রয়েছে। ইমরান খান বরাবরই বলেছেন, তার জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে পড়েছে সরকার।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানে আগাম নির্বাচনের দাবিতে বর্তমান জোট সরকারের বিরুদ্ধে গত ২৮ অক্টোবর লাহোর থেকে ‘লং মার্চ’ শুরু করেন ইমরান খান। সরকারবিরোধী এই লংমার্চ আগামী ১১ নভেম্বর ইসলামাবাদ পৌঁছাবে বলে আশা করা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ইমরান খানের ওপর গুলি চালানোর এই ঘটনা পাকিস্তানে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। কারণ শেহবাজ শরিফের বর্তমান সরকার এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তাদের অবস্থান থেকে সরে আসতে নারাজ।
লাহোর-ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসাদ রহিম খান বলেন, ‘বারবার যে প্রশ্নটি করা হচ্ছে তা হলো- আমরা যদি সংসদীয় ব্যবস্থার রাষ্ট্রই হই, এবং যদি পাকিস্তানে একটি বেসামরিক সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে হয়, তাহলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলতে দেওয়া উচিত। অর্থাৎ দেশে সাধারণ নির্বাচনে হতে দিন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবং জনসাধারণের বিশ্বাসের ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যা দেখছি, আমার আশঙ্কা- আজকের হত্যা প্রচেষ্টার পর তা (এই ধরনের হামলা) আরও বেড়ে যাবে।’
পাকিস্তানে আল জাজিরার সংবাদদাতা আবিদ হুসেন বলেছেন: ‘যদিও ইমরান খান নিজেই তার লংমার্চের সময় সম্ভাব্য রক্তপাতের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তারপরও এই ধরনের হামলা পাকিস্তানে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষকেই প্রতিফলিত করে।’
তিনি আরও বলেন, 'এর ফলে সরকারের ওপর চাপ বাড়বে। কারণ পিটিআই অভিযোগ করে আসছে যে শেহবাজ সরকার যেকোনো উপায়ে ইমরান খানকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে চায়। এমনকি ইমরান খান নিজেও গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকবার বলেছেন যে তার জীবন হুমকির মধ্যে রয়েছে।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী মুররিয়াম আওরঙ্গজেব বলেছেন, ইমরান খানের ওপর হামলার পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে সন্দেহভাজন বন্দুকধারীকে গ্রেপ্তার করেছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আমাদেরকাগজ/এইচএম


















