বিনোদন ২৯ মে, ২০২৩ ০৫:১৩

হুমায়ুন ফরীদি: অভিনয়ের বাতিঘর

আমাদের কাগজ রিপোর্ট: মঞ্চ, টেলিভিশন কিংবা হোক চলচ্চিত্র; সব মাধ্যমেই তিনি অভিনয় করে গিয়েছেন দাপটের সঙ্গে। ব্যক্তিজীবনটা পুরো সাদামাটা কাটালেও অভিনয়ে রীতিমত রাজত্ব করেছেন দুর্দান্ত প্রতাপে। অভিনয়ের মাধ্যমে যিনি আমৃত্যু জীবনের বর্ণীল আলো ছড়িয়েছেন তিনি আর কেউ নন, বরেণ্য অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি।

তিন ভুবনে, তিন দশকে অবিস্মরণীয় সাফল্য অর্জন করা হুমায়ুন ফরীদি শুধু একজন অভিনেতাই নন, একাধিক প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে তিনি ‘অভিনয়ের পাঠশালা’।

হুমায়ুন ফরীদিকে নিয়ে বর্ষীয়াণ অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘তিনি অনেক বড় মাপের একজন অভিনেতা। তিনি যখন অভিনয় করতেন তখন হাত নাড়তেন, পুরো শরীর দোল দিত। তার পুরো শরীরেই অভিনয় ফুটে উঠতো। তাঁর মত এতো বড় অভিনেতা জীবনে দেখিনি। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য যুদ্ধ করেছেন কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কখনও পরিচয় দেননি তিনি। তার এ ঋণ কখনো শোধ হবার নয়।’

আজ (২৯ মে) কিংবদন্তী এ অভিনেতার জন্মদিন। বেঁচে থাকলে ৭১ বছরে পা রাখতেন কিন্তু এগারো বছর আগেই তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। এখনো তার জন্মদিন কিংবা মৃত্যুদিন এলে চলচ্চিত্র কর্মী, ভক্তরা তাকে স্মরণ করেন শ্রদ্ধার সঙ্গে।

হুমায়ুন ফরীদির জন্ম ঢাকার নারিন্দাতে। বাবা এ টি এম নুরুল ইসলাম ছিলেন জুরী বোর্ডের কর্মকর্তা। বাবার বদলির চাকরির সুবাদে ফরিদীকে মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুরসহ অসংখ্য জেলায় ঘুরতে হয়েছে। মা বেগম ফরিদা ইসলাম গৃহিনী। ছন্নছাড়া স্বভাবের জন্য ছোটবেলায় ফরীদিকে ‘পাগলা’, ‘সম্রাট’, ‘গৌতম’- এমন অনেক নামে ডাকা হতো। মাদারীপুর ইউনাইটেড ইসলামিয়া গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে পাশ করে চাঁদপুর সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৭০ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে ভর্তি হন।

এরপরের বছর অর্থাৎ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যান। নয় মাস যুদ্ধের পরে লাল-সবুজের পতাকা হাতে ঢাকায় ফিরলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরেননি। টানা পাঁচ বছর বোহেমিয়ান জীবন কাটিয়ে শেষে অর্থনীতিতে অনার্স-মাস্টার্স করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। অনার্সে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যচর্চার পুরোধা ব্যক্তিত্ব নাট্যকার সেলিম আল দীনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন তিনি। ১৯৭৬ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নাট্য উৎসব আয়োজনেরও প্রধান সংগঠক ছিলেন ফরীদি। সেখানে ‘আত্মস্থ ও হিরন্ময়ীদের বৃত্তান্ত’ নামে একটি নাটক লিখে নির্দেশনা দেন এবং অভিনয়ও করেন। ছাত্রাবস্থায়ই ১৯৭৬ সালে তিনি ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হন। জড়িয়ে যান মঞ্চের সঙ্গে।

সেলিম আল দীনের ‘সংবাদ কার্টুন’-এ একটি ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করে ফরিদী মঞ্চে উঠে আসেন। অবশ্য এর আগে ১৯৬৪ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে কিশোরগঞ্জে মহল্লার নাটক ‘এক কন্যার জনক’-এ অভিনয় করেন। মঞ্চে তার সু-অভিনীত নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘শকুন্তলা’, ‘ফনিমনসা’, ‘কীত্তনখোলা’, ‘মুন্তাসির ফ্যান্টাসি’, ‘কেরামত মঙ্গল’ প্রভৃতি। ১৯৯০ সালে স্ব-নির্দেশিত ‘ভূত’ দিয়ে শেষ হয় ফরীদির ঢাকা থিয়েটারের জীবন।

এরপর আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় ‘নিখোঁজ সংবাদ’ ফরিদীর অভিনীত প্রথম টিভি নাটক। শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’ (১৯৮৭-৮৮)-এ ‘কান কাটা রমজান’ চরিত্রে ফরীদির অনবদ্য অভিনয় কেউ ভোলেনি। ‘দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা’, ‘একটি লাল শাড়ি’, ‘নীল নকশার সন্ধানে’ (১৯৮২), ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’ (১৯৮২), ‘বকুলপুর কতদূর’ (১৯৮৫)’, ‘মহুয়ার মন’ (১৯৮৬), ‘সাত আসমানের সিঁড়ি’ (১৯৮৬) ‘একদিন হঠাৎ’ (১৯৮৬), ‘ও যাত্রা’ (১৯৮৬) ‘পাথর সময়’, ‘সমুদ্রে গাঙচিল’ (১৯৯৩), ‘চন্দ্রগ্রন্থ’ (২০০৬), ‘কাছের মানুষ’ (২০০৬), ‘কোথাও কেউ নাই’ (১৯৯০), ‘মোহনা’ (২০০৬), ‘ভবেরহাট’ (২০০৭), ‘জহুরা’,‘আবহাওয়ার পূর্বাভাস’, ‘প্রতিধ্বনি’, ‘শৃঙ্খল’ (২০১০), ‘প্রিয়জন নিবাস’ (২০১১), ‘অক্টোপাস’, ‘আরমান ভাই দি জেন্টেলম্যান’ (২০১১)-আরো আরো অনেক নাটকে বিরামহীনভাবে দর্শকদের হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য টিভি নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে, ‘নীল নকশার সন্ধানে’ (১৯৮২), ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’ (১৯৮২), ‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’ (১৯৮৩), ‘ভবের হাট’ (২০০৭), ‘শৃঙ্খল’ (২০১০) ইত্যাদি নাটকে তিনি ছিলেন অনবদ্য।

নব্বইয়ের গোড়া থেকেই হুমায়ুন ফরীদির বড় পর্দার জীবন শুরু হয়। বাণিজ্যিক আর বিকল্প ধারা মিলিয়ে প্রায় ২৫০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। এরমধ্যে প্রথম ছবি তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’। এরপর তার অভিনীত সিনেমার মধ্যে ‘সন্ত্রাস’, ‘বীরপুরুষ’, ‘দিনমজুর’, ‘লড়াকু’, ‘দহন,’ ‘বিশ্বপ্রেমিক’, ‘কন্যাদান’ (১৯৯৫), ‘আঞ্জুমান’ (১৯৯৫), ‘দুর্জয়’ (১৯৯৬), ‘বিচার হবে’ (১৯৯৬),‘মায়ের অধিকার’ (১৯৯৬) ‘আনন্দ অশ্র’ (১৯৯৭), ‘শুধু তুমি’ (১৯৯৭), ‘পালাবি কোথায়’, ‘একাত্তুরের যীশু’, ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’, ‘মিথ্যার মৃত্যু’. ‘বিদ্রোহ চারিদিকে, ‘ব্যাচেলর’ (২০০৪), ‘জয়যাত্রা’, ‘শ্যামল ছায়া’ (২০০৪), ‘রূপকথার গল্প’ (২০০৬), ‘আহা!’ (২০০৭), ‘প্রিয়তমেষু’ (২০০৯) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ফাগুনের আগুনে বিষাদের কালো আঁভা ছড়িয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন অভিনয়ের কিংবদন্তি পুরুষ হুমায়ুন ফরীদি। কাঁদিয়েছিলেন কোটি ভক্তকে। জীবন্ত ফরীদি তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের স্বীকৃতি নিজের হাতে না পেলেও, মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হুমায়ুন ফরীদির মেয়ের হাতে এই পুুরস্কার তুলে দেন।

 

 

আমাদের কাগজ/টিআর