ডেস্ক রিপোর্ট।।
বোনের রহস্যজনক মৃত্যুর খবরে যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে ফাতেমার। তার ওপর ময়নাতদন্তের জন্য দাবি করা হয় ঘুষ। টাকার অভাবে মরদেহ নিতেও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা আর ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে স্বজন হারানো শোকাগ্রস্থ ফাতেমাকে।
দেশের সব মর্গেই একই চিত্র দেখা যায়। লাশ জিম্মি করে মৃতের স্বজনদের কাছ থেকে টাকা দাবি করে ডোমদের দল। টাকা না দিলে মিলে না লাশ।
কিন্তু ডোমেরা বলছেন, নিরুপায় হয়েই এভাবে টাকা আদায় করেন তারা, কারণ বেতনের টাকায় সংসার চলে না। তাছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে কোনো টাকাই পান না তারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে হাসপাতালের মর্গগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নানা দুর্নীতির ।
দেশের অর্ধেক মর্গেই ডোমের পদ খালি। সেখানে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করেন অনেকেই। যারা নিয়োগপ্রাপ্ত, তাদেরও বেতন দিয়ে সংসার চলে না। ফলে মরদেহ নিতে আসা স্বজনদের কাছে নিরুপায় হয়েই হাত পাতেন তারা।
স্বজনরা খুশি হয়ে টাকা দেয় বলে ডোমরা দাবি করলেও ময়নাতদন্ত নিয়ে আপনজন হারানো স্বজনদের পোহাতে হয় নানা ভোগান্তি।
গত ১৪ই সেপ্টেম্বর রাতে চাঁদপুর শহরের ওয়্যারলেস এলাকার বাসিন্দা তানজিনাকে জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রেখে পালিয়ে যায় তার স্বামী। তানজিনাকে মৃত ঘোষণা করে মরদেহ মর্গে পাঠিয়ে দেন চিকিৎসক। পরে তানজিনার পরিবার মরদেহ নিতে গেলে ময়নাতদন্তের জন্য টাকার চাওয়া হয়।
মৃত তানজিনার বড় বোন কানিজ ফাতেমা বলেন, "আমাদেরকে সাড়ে তিন ঘণ্টার মতো বসায়ে রাখছে। কোনো কাজ করছে না, বলছে লাশ পাহারা দেয়া হয়েছে, এখানে-ওখানে টাকা দিতে হবে। আমাদের কাছে কোনো টাকা নাই। আমরা কোনো টাকাপয়সা নিয়ে আসি নাই।"
তানজিনার বাবা মুনাফ মুন্সি বলেন, ১০-১২ হাজার টাকা চাচ্ছে যারা পোস্টমর্টেম করবে তারা, ডোমেরা।
২০শে অক্টোবর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত অটোরিকশা চালক মোহাম্মদ আলীর মরদেহ ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগ থেকে মর্গ পর্যন্ত আনতেই চলে দেন দরবার। টাকার পরমিাণ কম হওয়ায় সেই টাকা হাতেই নেয়নি ডোমেরা। মর্গের অফিসের পথ দেখিয়ে দেয় তারা লাশ নিতে আসা লোকেদের।
বেশিরভাগ জায়গায় ভ্যান চালকদের বিরুদ্ধে মরদেহ জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমন অভিযোগ আছে পুলিশের বিরুদ্ধেও।
থানার হয়ে কাজ করা ষাটোর্ধ্ব একজন ভ্যানচালক বলেন, "দারোগাও পার্ট খাইসে। টাকার কথা কইলে কয়, তোমরা নাও গিয়া। এই এখন লাশের লোকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কাজ সারলাম।"
আরেকজন ভ্যানচালক বলেন, "পায়ে চালায়ে ভ্যান দিয়ে ১০-১৫ মাইল দূর থেকে লাশ নিয়ে আসি। নিয়ে আসার পরে মানুষের সাথে ঝগড়া করে টাকা নেয়া লাগে। যদি থানা থেকে ওসি সাহেব বা পৌরসভা থেকে আমাদের একটু দেখতো তাহলে এমন করতে হতো না।"
দু’একটি বাদে সবগুলো মর্গেই ময়নাতদন্তের পর চলে টাকা নিয়ে দেন দরবার। অনেক সময় টাকা না পেলে মরদেহ সেলাইও করতে চান না ডোমরা।
স্বেচ্ছায় ডোমের কাজ করা ষাটোর্ধ্ব একজন বলেন, "৩৬ বছর শুধু লাশই টানছি। নেশায় থাকলে ডোমেরা ঠিকমতো লাশ কাটতে পারে না, ব্যাকাত্যারা, বিতিকিচ্চিরি করে কাটে। এমন সময় নিয়ে কেটে, নিজে সেলাই করে নিয়ে এসে ওদের টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে হাত থেকে সুঁই-সূতা কেড়ে নেয়। এমন পুলিশও আছে, যাওয়ার পরে বলে আমাকে ১০০ টাকা দে।"
দূর্ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ মর্গে আনার দায়িত্ব পুলিশের। এর খরচও তাদেরই বহন করার কথা। তারপরও হত্যা মামলার তদন্ত বাবদ প্রায় চার হাজার টাকা পান পুলিশ কর্মকর্তা। অথচ তারাও মৃতদের স্বজনের কাছ থেকে টাকা নেন বলে অভিযোগ আছে।






















