রায়হান শোভন
অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে কেরাণীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। ঢাকার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ভর্তি থাকা কয়েদি অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন কারারক্ষীরা। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না কারা কর্তৃপক্ষ।
অভিযোগ রয়েছে, এই অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে মূলত ডিউটি বণ্টনকারী সহকারী প্রধান কারারক্ষী রাশেদুল ইসলাম ও কারারক্ষী আমিনুল ইসলাম জড়িত। তাদের সঙ্গে কারা অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন আরও কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত রয়েছেন। ফলে চোখের সামনে এসব অনিয়মের ঘটনা ঘটলেও কেউ বাধা দিচ্ছেন না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ১৬ জন বন্দী চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে ক্যাসিনোকাণ্ডে আলোচিত যুবলীগের বহিস্কৃত নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, জিকে শামীম, ডেসটিনির চেয়ারম্যান রফিকুল আমিন অন্যতম। তারা চিকিৎসার নামে হাসপাতালে আয়েশী জীবনযাপন করছেন। তাদের সঙ্গে হাসপাতালে স্ত্রী বা আত্মীয়-স্বজনেরা নিয়মিত দেখা করছেন। বাসায় রান্না করা খাবার খাচ্ছেন এই কয়েদিরা। গোপনে মোবাইল ফোনেও সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন তারা। অথচ কয়েদিদের হাতে হ্যান্ডকাপ ও পায়ে বেড়ি পড়ানোর কথা থাকলেও তা পড়াচ্ছেন না কারারক্ষীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, এই কয়েদিদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন কারারক্ষীরা। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ব্লকে সিসিইউতে ভর্তি থাকা কয়েদি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের থেকে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ৯ হাজার টাকা নেন সহকারী প্রধান কারারক্ষী রাশেদুল ইসলাম। ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে ৯০১ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা কয়েদি সুলতানের কাছ থেকে ছয় হাজার টাকা করে নেন কারারক্ষী আমিনুল রাশেদ। এ ছাড়া প্রিজন সেলে ভর্তি থাকা ডেসটিনির চেয়ারম্যান রফিকুল আমিনের ব্যক্তিগত সহকারী প্রতি সপ্তাহে পুরাতন কারাগারে গিয়ে রাশেদুল ও আমিনুলকে দিয়ে আসেন সাত হাজার টাকা। এসব টাকা রাশেদুল হাতিয়ে নিচ্ছেন গুটিকয়েক কারারক্ষীর মাধ্যমে। তারা হলেন সবুজ মিয়া, শাহজালাল, সাজ্জাদ হোসেন, আরমান সরকার, শরীফুল ইসলাম, জামান হোসেন, শরীফুল ইসলাম, জামান হোসেন ও মেহেদী হাসান। যদি হাসপাতালে ডিউটি করে কোন কারারক্ষী রাশেদুল ও আমিনুলকে টাকা না দেয়, তা হলে তাদেরকে বরখাস্তের হুমকি দেন রাশেদুল ও আমিনুল।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাশেদুল ইসলাম ও আমিনুল ইসলাম। তাদের দাবি, তারা শুধু ডিউটি বণ্টন করেন। এর বাইরে তারা আর কিছুই জানেন না।
কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, কেরাণীগঞ্জ কারাগারের যেসব কয়েদিদের ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন, তাদের পাহাড়া দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন নাজিমউদ্দিন রোডের পুরান কারাগারের ব্যারাকে থাকা কারারক্ষীরা। গত দেড় মাস আগে ডেপুটি জেলার মনিরুলের সহযোগিতায় কারারক্ষীদের ডিউটি বণ্টনের দায়িত্ব পান রাশেদুল ইসলাম ও আমিনুল ইসলাম। এরপর থেকেই তারা কয়েদিদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে কারারক্ষীদের দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
তবে রাশেদুল ইসলাম ও আমিনুল ইসলাম দায়িত্ব পাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের চিনতেন না বলে দাবি করছেন ডেপুটি জেলার মনিরুল। তিনি আমাদের কাগজকে বলেন, তার সঙ্গে রাশেদুল ও আমিনুলের কোনো সখ্য নেই। দাপ্তরিক কাজে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। মনিরুল জানান, সম্প্রতি ঢাকার একটি হাসপাতালে করারক্ষীদের বিরুদ্ধে এক কয়েদিকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে তার সত্যতা পাওয়া যায়। এখন তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। পরবর্তীতে এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতালে সম্রাটের সাম্রাজ্য: সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ব্লকের সিসিউতে গিয়ে দেখা যায়, ক্যাসিনোকাণ্ডে আলোচিত ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট সিসিইউ ইউনিটে অন্যান্য সাধারণ রোগীদের সঙ্গেই আছেন। তার সামনে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য থাকলেও তার পরিবারের সদস্যদের আসা-যাওয়া করতে দেখা গেছে। তারা বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসছেন। এ ছাড়া নিয়ম অনুযায়ী হাতে পায়ে বেড়ি থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে সেসবের কিছুই দেখা যায়নি। এমনি তাকে মোবাইলও ব্যবহার করতে দেখা গেছে। অথচ গত বছর অক্টোবরে ঢাকায় অবৈধভাবে ক্যাসিনো ও জুয়ার বোর্ড পরিচালনার অভিযোগে সম্রাটকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এছাড়া ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগরীতে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা মেডিকেলে ধুমপান করেন আরেক কয়েদি: ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৯০১ নম্বর ওয়ার্ডের শেষ প্রান্তের কক্ষে গিয়ে দেখা মিলে কয়েদি ইফাত সুলতান। সেখানে গিয়েও কয়েদি ইফাত সুলতানের হাতে পায়ে বেড়ি দেখা যায়নি। সেখানে তাকে দেখা যায় হাফ প্যান্ট ও টি-শার্ট পরিহিত অবস্থায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সাথে খোশ গল্পে বিভোর অবস্থায়। অসুস্থতার অজুহাতে হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও তাকে দেখা যায় ধূপমান করতে। প্রতি বেলায় নিয়ম করে কয়েদির আত্নীয়-স্বজনও আসছে তার সাথে দেখা করতে। এ ছাড়া হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়রাও টাকার বিনিময়ে তার বিভিন্ন ফরমায়েশ খাটেন। অথচ কারাবিধি অনুযায়ী বিনা অনুমতিতে বন্দীরা তাদের পরিবারের কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন না। বাসায় রান্না করা খাবারো খেতে পারবেন না। যে ওয়ার্ডে তিনি চিকিৎসা নিবেন তাকে হাতকড়া পড়া অবস্থায় চিকিৎসা নিতে হবে।






















