ডেস্ক রিপোর্ট ।।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য ফারজানা ইসলাম এ বছর আলোচনায় আসেন ছাত্রলীগের সভাপতি শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর পদত্যাগের কুশীলব হয়ে।
উপাচার্য ফারজানার পৈতৃক বাড়ি শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলায়। যদিও ১৯৫৮ সালে তার জন্ম ঢাকায়। তিনি চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট। বাবা আব্দুল কাদের হাইকোর্টের ডেপুটি রেজিস্ট্রার ও মা ফাতেমা খাতুন গৃহিণী ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৮০ সালে অনার্স ও পরের বছর মাস্টার্স পাস করেন। ২০০১ সালে সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি পান।
তার শিক্ষকতা জীবনের শুরু হয় ১৯৮২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে যোগদানের মধ্য দিয়ে। ১৯৮৬ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ধীরে ধীরে হন অ্যান্থ্রোপোলজি ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান।
উপাচার্য নির্বাচনের ভোটাভুটিতে নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল হোসেন দুজনই পান ৪০ ভোট। পরে লটারির মাধ্যমে ফারজানা ইসলামকে প্রথম ঘোষণা করা হয়। ২০১৪ সালের ২ মার্চ তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম নারী উপাচার্য তিনি।
দায়িত্ব পেয়ে অধ্যাপক ফারজানা সাংবাদিকদের বলেন, আমরা দল-মত নির্বিশেষে সবাই মিলে জাহাঙ্গীরনগরকে একটি সুন্দর বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ব। আমরা ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমাদের প্রশাসন দল-মত নির্বিশেষে সবার প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ করবে।
শিক্ষকতার পাশাপাশি ‘নাগরিক উদ্যোগ’ নামে বেসরকারি একটি সংস্থার চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
২০১৪ সালে অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কার পান তিনি। তার সঙ্গে একইসময় এই পুরস্কার পান পর্বতারোহী ওয়াসফিয়া নাজরিন, কন্ঠশিল্পী ফরিদা পারভীন, অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, ক্রিকেটার সালমা খাতুন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন সাদেকা হালিম প্রমুখ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা বাজেট থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে ১ কোটি ও শাখা ছাত্রলীগকে ১ কোটি টাকা দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পরই জাবি ভিসি ও তার ‘পন্থি’ শিক্ষকরা তা অস্বীকার করেন। শুরু হয় ভিসির বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন’। আন্দোলন জোরদার হলে ছাত্রলীগের সঙ্গে বৈঠকের কথা স্বীকার করেন তিনি। তবে টাকা লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করেন।
ভিসি অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে পারিবারিক বিলাসিতার অভিযোগ সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর। অভিযোগগুলো হলো-
এক. ফারজানা ইসলামের জন্য একটি গাড়ি বরাদ্দ থাকলেও তিনি বর্তমানে তার পরিবারের জন্য আরও অতিরিক্ত দুটি গাড়ি ব্যবহার করছেন। এসব গাড়ির তেল খরচ বিশ্ববিদ্যালয়কেই বহন করতে হয়।
দুই. ২০১৭ সালে ভিসির স্বামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি নিয়ে নেত্রকোনায় দুর্ঘটনার শিকার হলে সেই গাড়ি মেরামত বাবদ পরিবহন অফিসকে দেড় লাখ টাকা খরচ করতে হয়।
তিন. নতুন যুক্ত হওয়া দুটি অ্যাম্বুলেন্স ভিসি ছাত্রদের না দিয়ে নিজের কাছে রেখেছেন। শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ তিনটি অ্যাম্বুলেন্সের একটি প্রায় সব সময়ই নষ্ট থাকে। এতে দুটি দিয়ে চাপ সামাল দেওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। কিন্তু ভিসির বাসায় থাকা দুটি অ্যাম্বুলেন্স সব সময় বসে থাকে, জরুরি প্রয়োজনেও তা পাওয়া যায় না। তবে একটি অ্যাম্বুলেন্স শিক্ষকরা ভিসির অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারেন।
চার. ভিসির বাসভবনের সামনের মাঠ তার ছেলে প্রতীক হোসেন দখলে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই মাঠে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা করতে পারেন না। তবে তার ছেলে ওই মাঠে নিয়মিতই ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করে থাকেন।
পাঁচ. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিদের স্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা ক্লাবের সভাপতি হয়ে থাকেন। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নারী হওয়ায় তার স্বামী আখতার হোসেনকে মহিলা ক্লাবের সভাপতি বানিয়েছেন।
সোমবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যা থেকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে তার বাসভবন অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। মঙ্গলবার (৫ নভেম্বর) সকালে তাদের কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অতর্কিত হামলা চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে। হামলার সময় পুলিশ ও ভিসিপন্থি শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।
এ বিষয়ে ভিসি জানান, আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো হামলা হয়নি। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সুশৃঙ্খলভাবে আন্দোলনকারীদের আমার বাসভবনের সামনে থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। আন্দোলনকারীদের পেছনে জামায়াত-শিবির রয়েছে। তারা গত কয়েকদিন ধরে আমাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। আমি বের হতে পারিনি। আমি এখন অফিস করব।






















