একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের জীবনে যে অপরিমেয় অবদান রাখতে সক্ষম, যুগে যুগে তা শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করা হয়েছে; এ নিয়ে লেখা হয়েছে ইতিহাসের উদাহরণ, রচিত হয়েছে সাহিত্য। কবি কাজী কাদের নেওয়াজ (১৯০৯-১৯৮৩) তার ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতায় খুব চমৎকারভাবে এই বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছেন। ওই কবিতার শুরুটি এমন :
‘বাদশাহ আলমগীর-
কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লীর।
একদা প্রভাতে গিয়া
দেখেন বাদশাহ-শাহজাদা এক পাত্র হস্তে নিয়া
ঢালিতেছে বারি গুরুর চরণে
পুলকিত হৃদে আনত-নয়নে,
শিক্ষক শুধু নিজ হাত দিয়া নিজেরি পায়ের ধুলি
ধুয়ে মুছে সব করিছেন সাফ্ সঞ্চারি অঙ্গুলি।’
এখানে আমরা দেখি, বাদশাহের ছেলেকে দিয়ে পানি ঢেলে পা ধুয়ে নিচ্ছেন শিক্ষক- এই দৃশ্য বাদশাহ দেখে ফেলার পর ওই শিক্ষক ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন; তার মনোভাব বোঝা যায় কবিতার পরের চরণগুলো থেকে :
‘শিক্ষক মৌলভী
ভাবিলেন আজি নিস্তার নাহি, যায় বুঝি তার সবি।’
পরে একসময় শিক্ষকের ভাবোদয় ঘটে :
‘হঠাৎ কি ভাবি উঠি
কহিলেন, আমি ভয় করি না’ক, যায় যাবে শির টুটি,
শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার
দিল্লীর পতি সে তো কোন ছার,’
বাদশাহ আলমগীর ওই শিক্ষককে ডেকে পাঠান। কবিতার পরের এক অংশে আমরা শিক্ষককে ডেকে পাঠানোর পর বাদশাহ আলমগীরের প্রতিক্রিয়ায় দেখি :
‘শিক্ষকে ডাকি বাদশা কহেন, “'শুনুন জনাব তবে,
পুত্র আমার আপনার কাছে সৌজন্য কি কিছু শিখিয়াছে?
বরং শিখেছে বেয়াদবি আর গুরুজনে অবহেলা,
নহিলে সেদিন দেখিলাম যাহা স্বয়ং সকাল বেলা”’
বিচলিত শিক্ষক এ সময় বাদশাহর কথা থামিয়ে বাদশাহকে জিজ্ঞেস করেন :
‘শিক্ষক কন- “জাহপানা, আমি বুঝিতে পারিনি হায়,
কি কথা বলিতে আজিকে আমায় ডেকেছেন নিরালায়?”
বাদশাহ্ কহেন, “সেদিন প্রভাতে দেখিলাম আমি দাঁড়ায়ে তফাতে
নিজ হাতে যবে চরণ আপনি করেন প্রক্ষালন,
পুত্র আমার জল ঢালি শুধু ভিজাইছে ও চরণ।
নিজ হাতখানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে
ধুয়ে দিল না’ক কেন সে চরণ, স্মরি ব্যথা পাই মনে।”’
শিক্ষক যা ভেবেছিলেন, ঘটনা ঘটলো তার একেবারেই বিপরীত; ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল ওই শিক্ষকের প্রতিক্রিয়া তখন :
‘উচ্ছ্বাস ভরে শিক্ষকে আজি দাঁড়ায়ে সগৌরবে
কুর্ণিশ করি বাদশাহে তবে কহেন উচ্চরবে-
“আজ হতে চির-উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির
সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর।”’
শিক্ষকের মর্যাদা এমন যে, স্বয়ং বাদশাহর ছেলে হলেও শিক্ষকের পা ধুয়ে দেয়া তার কর্তব্য, সৌজন্য ও ভদ্রতা; এমনকি একজন বাদশাহ নিজেও সেটিই মনে করেছেন।
শৈশবে পড়া এই কবিতায় শিক্ষকের এমন গগনচুম্বী মর্যাদার উদাহরণ আমার মধ্যে শিক্ষক হওয়ার সুপ্ত আকাক্সক্ষাকে তীব্রতর করেছিলো। নিশ্চয়ই আরো অনেককেই এমন আগ্রহী বা উৎসাহিত ও আনন্দিত করেছে। পেশা হিসেবে শিক্ষকতার যে মহত্ব, যে বিশালতা, সেটিই মূলত শিক্ষককে এমন মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু কতোজন শিক্ষক এই পেশার দায় ও আদর্শকে ধারণ করতে পেরেছেন?
শিক্ষক হিসেবে মর্যাদা পাওয়ার প্রমাণ হিসেবে শিক্ষার্থীকে দিয়ে নিজের পা ধুয়ে নেয়া জরুরি নয়, যদিও অনেকে অনেকটা এমন আনুগত্যই শিক্ষার্থীদের কাছে প্রত্যাশা করেন। শিক্ষক হওয়ার পর অনেকেই নিজেকে ‘ব্রাহ্মণ’ ভাবতে শুরু করেন; তারা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যে-কোনো ধরনের আচরণ করার একচ্ছত্র লাইসেন্স তাদের রয়েছে; আর শিক্ষার্থীদের কাজ হবে নিঃশর্তভাবে ও নির্বিচারে শিক্ষককে সম্মান ‘সেবা’ করে যাওয়া।
শিক্ষার্থীরা বিনা প্রশ্নে সম্মান ও আনুগত্য প্রদর্শন করে যাবে- এই দাবি করার আগে শিক্ষক হিসেবে আমরা নিজেরা কতোটা যোগ্য হতে পেরেছি, নিজেরা কতোটা ‘শিক্ষক’ হয়ে উঠতে পেরেছি, সে প্রশ্ন নিজেকে একবার করা দরকার।
শিক্ষকরা দলবাজি-রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি করছেন, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করছেন; এই কাজগুলো যারা করছেন, তারাও শিক্ষক হিসেবে সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রত্যাশা করেন; এই আবদার কতোটা যৌক্তিক?
শিক্ষকদের বোঝা উচিত, শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের চেয়ে নিম্ন তর প্রজাতির প্রাণি নয়; দুজনেরই আত্মমর্যাদার যথেষ্ট কারণ ও প্রয়োজন রয়েছে। কেবল শিক্ষার্থীদের জীবনে অফুরান ভূমিকা রাখেন বলে শিক্ষকদের অন্য অনেকের চেয়ে বাড়তি মর্যাদার চোখে দেখা হয়। কিন্তু এই মর্যাদা শর্তহীন নয়; এই মর্যাদাটুকু একজন শিক্ষককে অর্জন করে নিতে হবে। গায়ের জোরে শিক্ষার্থীর ‘সালাম-আদাব’ আদায় করা যায়, সম্মান বা শ্রদ্ধা নয়। শিক্ষককে ভীতিকর নয়, শ্রদ্ধাভাজন হয়ে উঠতে হবে।
যে কারণে এই লেখার অবতারণা : স্বনামধন্য একটি জাতীয় পত্রিকার একই দিনের (২৫ জুন ২০১৯) একই পাতায় পাশাপাশি প্রকাশিত দুটি খবরের শিরোনাম হলো : ‘শিক্ষকের বেতের আঘাতে চোখ হারাল ইমরান’ এবং ‘পিটিয়ে ছাত্রীর হাত ভাঙলেন শিক্ষিকা’। এ ধরনের শিরোনাম খুব বিরল নয়। অন্য অনেক দেশের চেয়ে অনেক দেরিতে হলেও বাংলাদেশে শিক্ষার্থীকে পেটানোর মতো নির্মম কাজটিকে কয়েক বছর আগে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মারধর নিষিদ্ধ করার পর দুঃখজনকভাবে দেখলাম, অনেক শিক্ষকের পাশাপাশি অনেক অভিভাবকও এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন; তাদের বিশ্বাস, শিক্ষকরা না পেটালে ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা শেখে না, তারা ‘মানুষ’ হয় না।
কেবল শারীরিক নয়, মানসিক নির্যাতনেরও ইতি টানা দরকার। শিক্ষকদের কাছে তীব্র লাঞ্ছনার শিকার হয়ে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষার্থী অরিত্রির আত্মহত্যার খবর আমরা দেখেছি (৩ ডিসেম্বর ২০১৮)। এর পরের মাসেই (১৪ জানুয়ারি ২০১৯) আত্মহত্যা করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রতীক; পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ আনা হয়, বিভিন্ন ইস্যুতে শিক্ষকদের অসহযোগিতা ও অন্যায় আচরণের কারণে মানসিক চাপ সইতে না পেরে প্রতীক আত্মহত্যা করেন। এমন আরো নানা কারণে ক্যারিয়ার বিপর্যস্ত হওয়া থেকে শুরু করে অনেক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে বলে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে।
শিক্ষকের মর্যাদা যতোই বেশি হোক, তা প্রশ্নাতীত হতে পারে না; যে শিক্ষক তার শিক্ষার্থীকে সম্মান করেন না, শ্রদ্ধা করেন না, তিনি নিজে তাদের কাছ থেকে সম্মান ও মর্যাদা পাওয়ার অধিকার রাখেন না। কোনো শিক্ষক যদি মনে করেন, তার ছাত্র বা ছাত্রীটি তার পা ধুয়ে দেবে, ওই শিক্ষককে প্রয়োজন পড়লে তার ছাত্র বা ছাত্রীটি পা ধুয়ে দেয়ার মানসিকতাও রাখতে হবে। শিক্ষক অসুস্থ হলে বা তার আরামের জন্যে তার ছাত্র বা ছাত্রীটি পা টিপে দিতে পারলে ওই ছাত্র বা ছাত্রীটি অসুস্থ হলে তার পা টিপে দিতে ওই শিক্ষকের বাধা কোথায়? শিক্ষকের পায়ে হাত দিলে ছাত্রের সম্মান না গেলে শিক্ষার্থীর পায়ে মমতার হাত বুলিয়ে দিলে শিক্ষকের ‘জাত’ যাবে কেন?
কোনো ব্যক্তিই অন্য একজন ব্যক্তিকে অপমান-অপদস্থ বা শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের অধিকার রাখেন না; শিক্ষকরাও না। এমনকি বাবা-মাও সন্তানকে অপমান-নির্যাতন-নিপীড়নের অধিকার রাখেন না। শিক্ষকদের বলা হয় সমাজের নির্মাতা, জাতির বিবেক। বিবেক এমন নির্দয়-নির্মম-অবিবেচক হলে চলে না- এই বোধ আমাদের কবে হবে?
সজীব সরকার : সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন, সেন্ট্রাল উইমেন’স ইউনিভার্সিটি। লেখক ও গবেষক। ই-মেইল : sajeeb_an@yahoo.com






















