মিলন পাঠান
আবুল হাসনাত ও হায়দার আনোয়ার খান জুনো
আজকে চলে গেলেন আবুল হাসনাত। মাহমুদ আল জামান নামে কবিতা লিখেছেন। গত ২৯ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার চলে গেলেন বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা হায়দার আনোয়ার খান জুনো।
ষাটের দশকের কীর্তিমানেরা ক্রমশ চলে যাচ্ছেন। সম্ভবত কমরেড জুনো সিনিয়র। দুজনেই পরস্পর ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলের সঙ্গী। চীন-রুশ বিভাজনে দুজন দুই মেরুতে চলে গিয়েছিলেন।
দুই মেরুতে হলেও মুক্তিযুদ্ধে দু'জনেই অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। শেষজীবনে দু'জনেই সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে চলে গিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে সম্ভবত দু'জনই আবার এক-কাতারে শামিল হয়েছিলেন। হয়ত নতুন পথের সন্ধান করছিলেন অবিরত। এই জীবনে খুজে না-পেলেও আরেক জীবনে নিশ্চয়ই খুজে পাবেন। দু'জনের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।
আবুল হাসনাত
মুক্তিযুদ্ধকালে ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি ছিলেন। দৈনিক সংবাদের দীর্ঘকালের সাহিত্য সম্পাদক। প্রায় চল্লিশ বছর। বিগত চব্বিশ বছর ধরে কালি ও কলম সম্পাদনা করে আসছিলেন। চিত্রকলা বিষয়ক ত্রৈমাসিক ‘শিল্প ও শিল্পী’রও তিনি সম্পাদক ছিলেন। দুটোই বেঙ্গল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। একাধারে কবি, শিল্পসমালোচক, শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গ্রন্থসমালোচক, সম্পাদক, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনীতিক। কী ছিলেন না তিনি! আর হ্যা, তিনি ভীষণরকম নিভৃতচারী ছিলেন। বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন ও বিশাল কর্মবীর হওয়া সত্ত্বেও অনালোচিতই থেকেছেন। সম্ভবত বোদ্ধাদের কাছে তিনি প্রণম্য ছিলেন। গ্রন্থসমালোচনাকে তিনি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। লেখক ও লেখা- উভয়কেই পাঠকের কাছে আরাধ্য করে তুলতেন।
আবুল হাসনাতের 'হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে' এবং 'প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য'- এই দু'টি স্মৃতিকথার বই গত বইমেলায় বেরিয়েছিল। মেলার শেষদিন ২৯ তারিখে জার্নিম্যান বুকস থেকে তার অটোগ্রাফসমেত সংগ্রহ করেছিলাম। তার লেখা পড়লেও, এই প্রথম তার সঙ্গে সামনাসামনি পরিচয়। মনে পড়ে, তারিক সুজাত ভাই ও সাদিকুর রহমান পরাগ ভাই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। কিছু কথাও হলো।
'হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে' বইটি ক'মাস আগে পড়েছি। আমার মতো করে একটা পাঠপ্রতিক্রিয়াও লিখেছিলাম। ফেসবুকেই। এই সূত্রে দ্বিতীয়বার যোগাযোগ হলো। তিনি ফেসবুক চালাতেন না, মেইলে লেখাটি নিয়েছিলেন। একটু ভয়ে ছিলাম, কিছুটা তীর্যক সমালোচনাও করেছিলাম। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, আবুল হাসনাতের ঔদার্য! সমালোচনাকে এত সহজভাবে নিলেন যে আমি মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। পড়ে, বারবার ধন্যবাদ দিয়েছিলেন। মনে হয়েছিল অজাতশত্রু মানুষ। সেই সহজিয়া মানুষটি আজ না ফেরার দেশে চলে গেলেন।
কথা ছিল, 'প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য' বইটিও পড়ে আমার মতো করে পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখবো। এতদিনে হয়ত পড়া এবং প্রতিক্রিয়াও লেখা হয়ে যেতো। কিন্ত বইটি আমার অত্যন্ত কাছের বড় ভাই হাসানুজ্জামান লিটন ভাইয়ের কাছে থাকায় সম্ভব হয়নি। লিটন ভাই-ই এই বই দুটো গিফট করেছিলেন। হায়, হাসনাত ভাই! অঙ্গীকারটুকু পালিত হলোনা, আপনার জীবদ্দশায়। আপনার এই টুকরো স্মৃতিটুকু আমার হৃদয়ে অমলিন থাকবে।
আবুল হাসনাত সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে চলে গিয়েছিলেন বহু আগেই। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, খাল কাটা ও হ্যা/না ভোটে সিপিবি'র সমর্থনের বিরোধীতা করে আরও কয়েকজন সহযোদ্ধার সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিলেন।কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের সঙ্গে মতদ্বৈততা চরমে পৌছলেও ভিন্ন দল গঠন বা যোগদান করেন নাই। আজীবন মার্কসবাদী-ই থেকেছেন। যা তার সাহিত্যচর্চার অন্যতম উপাদান।
আমাদের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন আবুল হাসনাত। তার অভাব অপূরণীয়। তার একমাত্র কন্যা দিঠি আপা’র মুখ বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
তার স্মৃতিময় কর্মমুখর জীবনের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। পরিবার শোক কাটিয়ে উঠুক।
হায়দার আনোয়র খান জুনো
পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি। রুশ-চীন এই দুই ভাগে ছাত্র ইউনিয়ন বিভক্ত হলে তখনকার বহু তেজস্বীর মতো জুনোও নিজেকে চীনপন্থী কাতারে শামিল করেন। বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করে, প্রথম সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
চীনপন্থীদের মধ্যে একমাত্র কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি- সকল অর্থে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের সুপ্রিম কমান্ডের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে সমন্বয় কমিটি মুক্তিযুদ্ধ করেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের সীমিত সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত এলাকাতেই সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। হায়দার আনোয়ার খান জুনো এই গ্রুপের প্রথমসারির সংগঠক ছিলেন। কাজী জাফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া এবং হায়দার আনোয়ার খান জুনো। সম্ভবত এই সবাইকেই প্রথম সারির সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করা যায়। সকলেই ষাটের দশকের ছাত্রনেতা। লেখাবাহুল্য, রনো এবং জুনো সহোদর।
কমরেড রনো ও জুনো- সহোদর তাঁদের সামগ্রিক রাজনৈতিক জীবনে আরও দু'টি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত তাঁদের অনেক নেতা-বন্ধু-সহকর্মী-সহযোদ্ধার মতো স্বাধীন বাংলাদেশের দুটি সামরিক সরকারের মন্ত্রী-এমপি-নেতা হন নাই। সত্তর-আশির দশকে ইউপিপি নেতা হিসেবে কিঞ্চিৎ প্রাথমিক সম্পর্কযুক্ত হলেও পরে পিছিয়ে এসেছেন। রাজনৈতিক নানান পালাবদলে তাঁরাও বদলেছেন, কিন্তু তাঁদের নির্মিত কাঠামোর মধ্যেই বদলেছেন। রনো দল বদল করেন, চীনপন্থী থেকে রুশপন্থীতে ফিরেন। জুনো সক্রিয় রাজনীতি থেকেই দূরে চলে যান। সাংস্কৃতিক সংগঠন গণসংস্কৃতি ফ্রন্টের নেতৃত্ব দেন, বাংলাদেশ-কিউবা সমিতির নেতৃত্ব দেন। আমার স্থির বিশ্বাস, তাঁরা চাইলে নিশ্চিতভাবেই জাতীয়ভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হতে পারতেন। কিন্তু সে পথে যান নাই। এখানেই এই সহোদরদের বিশেষত্ব।
জুনো লেখালেখি করেছেন নিয়মিত। গল্প-উপন্যাসও লিখেছেন। আগুনঝরা সেই দিনগুলো নামে রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিকথা লিখেছেন।
একটি ঘটনার উল্লেখ করছি।
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও অনেক যায়গা তখনও পাকিস্তান বাহিনীর দখলে ছিল। ধানমন্ডি বত্রিশে বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রতিবেশি ছিলেন স্বনামধন্য ইঞ্জিনিয়ার হাতেম আলী খানের পরিবার। বলাবাহুল্য রনো-জুনোদের পিতা ছিলেন হাতেম আলী খান। তাঁদের পারিবারিক সুসম্পর্ক ছিল। বিজয়ের দিনেই জুনোদের খালাতো বোন ডাঃ ডোরা আনন্দে উদ্বেল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে খালার বাসায় এসেছিলেন। খালা-খালু-নানী এবং খালাতো ভাই জুনোর স্ত্রী চপলকে নিয়ে আবার ঘুরতে বেরিয়েছিলেন। বিজয় উদযাপন করতে। হাতেম আলী খান ভেবেছিলেন প্রতিবেশি পরিবারের খোঁজ নিতে। বঙ্গবন্ধু পরিবার তখন আঠারো নম্বরের একটি বাড়িতে বন্দী। কিন্তু হাতেম আলী খান জানতেন না যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও সেই বাড়িতে বন্দী বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যরা তখনও স্বাধীন হন নাই, মুক্ত হতে পারেন নাই। গাড়ি নিয়ে সেই বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই পরপর দুটি গুলি বর্ষিত হলো গাড়িতে। একটি ড্রাইভারের পেটে। আরেকটি চপলের মাথা থেতলে ডোরার মাথায়। ভাঙা কাঁচের টুকরোর আঘাতে রনো-জুনোদের মায়ের হাত কেটে রক্তাক্ত। হাতেম আলী খান দ্রুত বের হতে গিয়ে পায়ে চোট লেগে নিশ্চল। বাসার ভিতর থেকে বেগম মুজিব দেখতে পেয়ে সাহায্যে আসতে চাইলেও বাধাপ্রাপ্ত হন। শেখ রেহানাও তাঁদের হাতেম আলী চাচাকে দেখতে পেয়ে আসতে চেয়েছিলেন কিন্তু সে-ও বাধাপ্রাপ্ত হন। বলা যায় ঘটনাস্থলেই ড্রাইভারের মৃত্যু হয়, কাছাকাছি হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক ডাঃ ডোরার মৃত্যুবরণের কথা জানান।
আগুনঝরা সেই দিনগুলো নামে রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিকথায় হায়দার আনোয়ার খান জুনো এবং শতাব্দী পেরিয়ে নামক আত্মজীবনীতেই হায়দার আকবর খান রনো এই ঘটনাটির উল্লেখ করেছেন।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা-ও একটি লেখায় এই ঘটনাটির উল্লেখ করেছেন। সাংবাদিক সঞ্চিতার সম্পাদনায় প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানার সাথে একান্ত আলাপচারিতাঃ অন্তরঙ্গ আলোয় বঙ্গবন্ধুর পরিবার নামক বইটিতেও এই ঘটনাটির সম্ভবত উল্লেখ আছে।
হায়দার আনোয়ার খান জুনো এবং তাঁর পরিবার এভাবেই বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে মিশে আছেন রক্তের আলপনায়।
তিনি প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর কাঙ্ক্ষিত সমাজতন্ত্রের পথে পুরোটা জীবন হেঁটেছেন, এটা এক বিরাট আত্মত্যাগ।
তাঁর জীবন ও কর্মের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
দু’জন নিভৃতচারী মানুষ আমাদের আকাশ থেকে হারিয়ে গেলেন। তারা যতটা আলোচনার দাবী রাখেন, ততটা বোধহয় আমরা করিনি বা করতে পারিনি। বাংলাদেশ ও বাঙালির, এ-এক দীনতা!
#লেখাটি মিলন পাঠানের ফেসবুক আইডি থেকে সংগৃহীত...






















