সম্পাদকীয় ২৯ জুলাই, ২০১৯ ০৮:২৪

আয়বৈষম্য নিরসনে প্রয়াস অনুপস্থিত

ড. মইনুল ইসলাম।। 

অনুন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতির তাত্ত্বিক চিন্তাধারায় ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ ধারণাটি একটি চাঞ্চল্যকর সংযোজন, যেটি বিশ্বের উপনিবেশ-উত্তর অনুন্নত দেশগুলোয় কেন দীর্ঘদিন অনুন্নয়ন গেড়ে বসে রয়েছে, তার ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য সাম্প্রতিক কালে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৬৫ সাল থেকে দীর্ঘ ৩৩ বছর ক্ষমতাসীন থাকার পর ১৯৯৮ সালে একনায়ক সমরপ্রভু সুহার্তোর পতনের পর তার শাসনামলের অভূতপূর্ব প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পরিবারতন্ত্র, আত্মীয়তোষণ ও দলতোষণ এবং সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনকে ব্যাপক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করার জন্য এ ক্রোনি ক্যাপিটালিজম ধারণাটি উন্নয়নতাত্ত্বিকরা বিশেষভাবে ব্যবহার করেছেন। ১৯৭৫-এর সামরিক অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের সরকারগুলোর আমলে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এমন ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের নিকৃষ্ট নজির করে ফেলা হয়েছে। দুঃখজনক হলো, ১৯৯১ সালে এ দেশে ভোটের রাজনীতি চালু হওয়া সত্ত্বেও ‘স্বজনতোষী পুঁজিবাদ’ বা ক্রোনি ক্যাপিটালিজম আজও নীতিপ্রণেতাদের কাছে ‘হলি রিটের’ মর্যাদায় বহাল রয়েছে। স্বৈরাচারী এরশাদ আশির দশকে সুহার্তোর ওই মডেল অনুসরণ করে এ দেশে দুর্নীতিকে সর্বনাশা স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৯১ সালের পর গত ২৮ বছরে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারগুলো এ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে আরো সর্বব্যাপী করে তুলেছে, ফলে এখন কিছু মানুষকে এমনও বলতে শোনা যায় যে এরশাদের শাসনকালের চেয়ে অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। এরশাদ আমলের তুলনায় ক্রমে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে তখনকার সাড়ে ৪-৫ শতাংশ থেকে এখন ৮ শতাংশে পৌঁছলেও এ প্রবৃদ্ধির সুফল প্রধানত কয়েক হাজার ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছে পুঞ্জীভূত হয়ে চলেছে।

পাঠকরা স্মরণ করুন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ওয়েলথ এক্স’-এর প্রতিবেদন ওয়ার্ল্ড আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৮ মোতাবেক ২০১২ সাল থেকে ২০১৭—এ পাঁচ বছরে অতিধনীদের সংখ্যা বৃদ্ধির দিক দিয়ে বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে পেছনে ফেলে বিশ্বে এক নম্বর স্থানটি দখল করেছে বাংলাদেশ। ওই পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে বার্ষিক ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। ওই গবেষণা প্রতিবেদনে ৩০ মিলিয়ন বা ৩ কোটি ডলারের (প্রায় ২৫২ কোটি টাকা) বেশি নিট সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিদের ‘আলট্রা হাই নেটওয়ার্থ’ ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করে বলা হয়েছে, বিশ্বে মোট ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫৫ জন ধনকুবেরের সবচেয়ে বেশি ৭৯ হাজার ৫৯৫ জন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এ তালিকায় দ্বিতীয় থেকে দশম অবস্থানে জাপান, গণচীন, জার্মানি, কানাডা, ফ্রান্স, হংকং, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও ইতালি। এ ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫৫ জন ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১২ দশমিক ৯ শতাংশ কিন্তু তাদের সম্পদ বৃদ্ধির হার ছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ বেড়ে ২০১৭ সালে দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন (মানে সাড়ে ৩১ লাখ কোটি) ডলারে। গত পাঁচ বছরে ধনকুবেরের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে গণচীনে ও হংকংয়ে কিন্তু ধনকুবেরের সংখ্যার প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বাংলাদেশে। গণচীনে ধনকুবেরের প্রবৃদ্ধির হার ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ন্যক্কারজনক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জনের পরও দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের শীর্ষ নেতৃত্বের টনক নড়ছে না। বেশ কয়েকজন ধনাঢ্য ব্যক্তিকে তাদের অতীতের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন না করে বরং এখন দেশের অর্থনীতি পরিচালনার প্রত্যক্ষ দায়িত্ব  দেয়া হয়েছে ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর গঠিত সরকারে।

এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ধনকুবেরের সংখ্যা ২৫৫। ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এ দেশে যেভাবে নিজেদের আয় ও ধন-সম্পদ লুকোনোতে বিশেষ পারদর্শিতা প্রদর্শন করেন, তাতে হয়তো দেশে ধনকুবেরের প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি হবে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি লজ্জাজনক অর্জন। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের জিডিপি ও জিএনআই প্রবৃদ্ধির হার ক্রমে যেভাবে বেড়ে চলেছে, সেই প্রবৃদ্ধি এ ধনকুবেরদের সম্পদের প্রবল স্ফীতি ঘটানোর অর্থই হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফলের সিংহভাগ দেশের ধনাঢ্যদের কাছে জমা হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ন্যায্য হিস্যা থেকে দেশের সাধারণ জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে ক্ষমতাসীন মহলের ভ্রান্ত নীতির কারণে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতির মধ্যে ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র পুনঃস্থাপন হয়েছে। ২০১১ সালে পাস হওয়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার সে রায়কে সংবিধানে ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার এখনো ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতির’ অহিফেনের মৌতাতে মেতে রয়েছে। ফলে লজ্জাজনকভাবে এ আমলে ক্রোনি ক্যাপিটালিজম আরো দৃঢ়ভাবে গেড়ে বসছে অর্থনীতি ও রাজনীতিতে।

পাঠকদের আরো স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর বিশ্বখ্যাত এনজিও অক্সফাম বৈষম্য কমানোর প্রতিশ্রুতি সূচকের বিবেচনায় ১৫৭টি দেশের র্যাংকিং ঘোষণা করেছে। ওই র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৮তম, যেটা দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে সপ্তম, মানে খুবই হতাশাজনক। সামাজিক খাতগুলোয় ব্যয়, করারোপ ও শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় সরকারের প্রয়াস—এ তিনটি বিষয়ের ভিত্তিতে সূচকটি তৈরি করা হয়েছে। একমাত্র ভুটান বাংলাদেশের চেয়ে এ সূচকে খারাপ অবস্থানে রয়েছে, ১৫২ নম্বরে। ওই র্যাংকিংয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি ছয়টি দেশের অবস্থান—মালদ্বীপ ৬৮তম, শ্রীলংকা ১০২তম, আফগানিস্তান ১২৭তম, পাকিস্তান ১৩৭তম, নেপাল ১৩৯তম ও ভারত ১৪৭তম। এর মানে বৈষম্য নিরসনের ব্যাপারে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তেমন মনোযোগী নয় এবং সূচকের তিনটি বিষয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতির ঘাটতি প্রকটভাবে ধরা পড়ছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈষম্যের ব্যাপারে এমন অবজ্ঞার মানসিকতাকে আমি ‘অগ্রহণযোগ্য’ মনে করি। ‘ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ’ অর্জনের মাধ্যমে ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের মৃগয়াক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার কলঙ্কতিলক এখন বাংলাদেশের কপালে শোভা পাচ্ছে বৈষম্য নিরসনে রাষ্ট্রের নিস্পৃহতার কারণেই। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গত ৪৪ বছরের ইতিহাসে ক্ষমতার যতই পালাবদল হোক, সমরপ্রভু কিংবা 

ভোটে নির্বাচিত রাজনৈতিক দল বা জোট যতবারই ক্ষমতায় আসুক, প্রতিটি ক্ষমতাসীন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এ দেশে দ্রুত বেড়ে চলেছে শত শত ‘রেন্ট সিকিং’ কোটিপতি। ৪৪ বছর ধরে সমরপ্রভু জিয়াউর রহমান ও তার রাজনৈতিক দল বিএনপি, সমরপ্রভু এরশাদ ও তার দল জাতীয় পার্টি, খালেদা জিয়ার বিএনপি, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ, আবার খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট (মূলত বিএনপি-জামায়াত জোট), ২০০৭-০৮ সালের ছদ্মবেশী সামরিক শাসন এবং সর্বশেষে শেখ হসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতাসীন হয়েছে কিন্তু উল্লিখিত কোটিপতি তৈরির কারখানা দিন দিন শক্তিশালী হয়েই চলেছে। বৈষম্য বৃদ্ধির ব্যাপারে ক্ষমতাসীন সব সরকার উদাসীন থাকার কারণেই আয় ও সম্পদের পুঞ্জীভবন বর্তমান বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে। এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের আলামত বারবার পেয়েও তারা নির্বিকার! ১৯৭৩ সালে বিআইডিএসের গবেষণায় নির্ণীত হয়েছিল, বাংলাদেশের আয়বৈষম্য পরিমাপক জিনি সহগ শূন্য দশমিক ৩৬। ২০১৬ সালের হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে অনুযায়ী তা শূন্য দশমিক ৪৮৩-এ পৌঁছে গেছে। জিনি সহগ বেড়ে যেসব দেশে শূন্য দশমিক ৫ পেরিয়ে যায়, ওগুলোকে উন্নয়ন তত্ত্বে ‘উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশ’ কিংবা ‘বিপজ্জনক আয়বৈষম্যের দেশ’ বিবেচনা করা হয়, বাংলাদেশ এর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। আরেকটি পরিমাপকের গতি-প্রকৃতির মাধ্যমে ২০১০ ও ২০১৬ সালের মধ্যে আয়বৈষম্য বিপজ্জনকভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিপক্ষে এবং ৫-১০ শতাংশ ধনাঢ্য গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে চলে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি ফুটে উঠেছে—২০১০ সালে দরিদ্রতম ৫ শতাংশ জনসংখ্যার মোট আয় ছিল মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে মাত্র শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশে নেমে গেছে। ২০১০ সালে দরিদ্রতম ১০ শতাংশ জনসংখ্যার মোট আয় ছিল মোট জিডিপির ২ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা মাত্র ১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশে নেমে গেছে। সমস্যার আরেক পিঠে দেখা যাচ্ছে, দেশের ধনাঢ্য ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর দখলে ২০১০ সালে ছিল মোট জিডিপির ৩৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে বেড়ে ৩৮ দশমিক ১৬ শতাংশে পৌঁছে গেছে। আরো দুঃখজনক হলো, জনগণের সবচেয়ে ধনাঢ্য ৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীর দখলে ২০১৬ সালে চলে গেছে মোট জিডিপির ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ।

ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য সমস্যা মোকাবেলা করা দুরূহ কিন্তু অসম্ভব নয়। রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের সদিচ্ছা এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে প্রয়োজন, কারণ আয় ও সম্পদ পুনর্বণ্টন খুবই কঠিন, রাজনৈতিক নীতি পরিবর্তন ছাড়া অর্জন করা যায় না। সমাজের শক্তিধর ধনাঢ্য গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থ আয় পুনর্বণ্টন নীতিমালাকে ভণ্ডুল করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করবেই। দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, গণচীন, ভিয়েতনাম, কিউবা, ইসরায়েল ও শ্রীলংকায় রাষ্ট্র নানা রকম কার্যকর আয় পুনর্বণ্টন কার্যক্রম গ্রহণ ও সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে জিনি সহগ বৃদ্ধিকে শ্লথ করতে বা থামিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যদিও সাম্প্রতিক বিশ্বে জিনি সহগ কমানোর ব্যাপারে কিউবা ছাড়া অন্য কোনো উন্নয়নশীল দেশকে তেমন একটা সাফল্য অর্জন করতে দেখা যাচ্ছে না। এ দেশগুলোর মধ্যে কিউবা, গণচীন ও ভিয়েতনাম এখনো নিজেদের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে দাবি করে, বাকি দেশগুলো পুঁজিবাদী অর্থনীতির অনুসারী হয়েও শক্তিশালী বৈষম্য নিরসন নীতিমালা গ্রহণ করে চলেছে। উপরের বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশে সফল ভূমি সংস্কার এবং কৃষি সংস্কার নীতিমালা বাস্তবায়ন হয়েছে। নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির মতো ইউরোপের কল্যাণরাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রীয় নীতি অনেক বেশি আয় পুনর্বণ্টনমূলক, যেখানে অত্যন্ত প্রগতিশীল আয়কর ও সম্পদকরের মতো প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে জিডিপির ৩০-৩৫ শতাংশ সরকারি রাজস্ব হিসেবে সংগ্রহ করে ওই রাজস্ব শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা (প্রধানত প্রবীণ জনগোষ্ঠীর পেনশন, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসন), পরিবেশ উন্নয়ন, নিম্নবিত্ত পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা, গণপরিবহন, বেকার ভাতা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হয়। এ রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা বাহিনী, সিভিল আমলাতন্ত্র ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর জন্য সরকারি ব্যয় জিডিপির শতাংশ হিসেবে খুবই অনুল্লেখ্য। এ কল্যাণরাষ্ট্রগুলোয় এবং বৈষম্যসচেতন উন্নয়নশীল দেশগুলোয় যে কয়েকটি বিষয়ে মিল দেখা যাচ্ছে সেগুলো হলো:

১. রাষ্ট্রগুলোয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ের শিক্ষায় একক মানসম্পন্ন, সর্বজনীন, আধুনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখার ব্যাপারে রাষ্ট্র সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে চলেছে।

২. রাষ্ট্রগুলোয় অত্যন্ত সফলভাবে জনগণের সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

৩. রাষ্ট্রগুলোয় প্রবীণদের পেনশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

৪. রাষ্ট্রগুলোয় সর্বজনীন বেকার ভাতা চালু রয়েছে।

৫. এসব দেশে নিম্নবিত্ত জনগণের জন্য ভর্তুকি মূল্যে রেশন বা বিনা মূল্যে খাদ্যনিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রয়েছে।

৬. প্রবীণ জনগণের আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অগ্রাধিকারমূলক ব্যবস্থা উন্নত-উন্নয়নশীল নির্বিশেষে এসব দেশে চালু রয়েছে।

৭. এসব দেশে গণপরিবহন সুলভ ও ব্যয়সাশ্রয়ী এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়।

৮. এসব দেশে রাষ্ট্র ‘জিরো টলারেন্স অগ্রাধিকার’ দিয়ে দুর্নীতি দমনে কঠোর শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা চালু করেছে।

৯. এসব দেশ ‘মেগাসিটি’ উন্নয়নকে সফলভাবে নিরুৎসাহিত করে চলেছে এবং গ্রাম-শহরের বৈষম্য নিরসন ও আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসনে খুবই মনোযোগী।

১০. দেশগুলোয় ‘ন্যূনতম মজুরির হার’ নির্ধারণ করে কঠোরভাবে প্রতিপালনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

১১. নিম্নবিত্তদের আবাসনকে সব দেশেই অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

১২. এসব দেশে কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত কৃষিজাত পণ্যের ন্যায্য দাম পান, তার জন্য কার্যকর সরকারি নীতি বাস্তবায়ন হয়েছে।

১৩. ব্যক্তি খাতের বিক্রেতারা যেন জনগণকে মুনাফাবাজির শিকার করতে না পারে, সেজন্য এসব দেশে রাষ্ট্র কঠোর নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে।

আমাদের দেশে রাষ্ট্রকে জনগণের মালিকানাধীন ‘গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র’ করা গেলে উল্লিখিত উন্নয়ন কৌশলগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ করা সম্ভব হবে। শেখ হাসিনা প্রায়ই বলছেন, তিনি বাংলাদেশকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে চান, যেখানে এ দেশকে বিশ্বে কেউ আর দরিদ্র দেশ বলতে পারবে না। আয়বৈষম্যের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে দেশকে টেকসইভাবে দারিদ্র্যমুক্ত করা যাবে না। তাই তার এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে তাকে ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের পথ থেকে সরে আসতেই হবে। ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অতীত কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করতেই হবে। পুঁজি লুটেরারা এ দেশের জনগণের শত্রু। তাদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা দিলে তারা জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল নিজেদের দখলে নেয়ার ব্যবস্থাই পাকাপোক্ত করবে, দেশ থেকে পুঁজি বিদেশে পাচার করবে, ব্যাংকঋণ লুণ্ঠন আরো জোরদার করবে, দুর্নীতিকে আরো সর্বনাশা স্তরে নিয়ে যাবে। এ পথ বঙ্গবন্ধুকন্যার হতে পারে না। ক্রোনি ক্যাপিটালিজম চালু করার জন্য বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন করেননি।                                                            

 

ড. মইনুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়