রাজনীতি ২২ আগস্ট, ২০১৯ ০৫:০৯

বাংলাদেশকে বাঁচানো এক মাহাবুবের গল্প

ডেস্ক রিপোর্ট।। 

২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে যখন গ্রেনেডের তাণ্ডব তখন শেখ হাসিনাকে নিরাপদে গাড়িতে তুলে দিয়ে ঘাতকের বুলেটবিদ্ধ হয়ে রাজপথে লুটিয়ে পড়েন বিশ্বস্ত দেহরক্ষী মাহবুব। নিভে যায় তার জীবন প্রদীপ। সেদিনের সেই বুলেটটি দেহরক্ষী মাহবুবকে স্পর্শ না করলে কেড়ে নিতে পারত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবন।

সুধাসদনে ফিরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, "যে মাহবুবকে আমি যাওয়ার আগে রাগারাগি করলাম, প্রোগ্রামে যেতে নিষেধ করলাম,সেই মাহবুবই আজ আমাকে বাঁচাতে গিয়ে প্রান দিলো।"

সেই আত্মত্যাগে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখা হলেও তার অনুপস্থিতি আজ কঠিন বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়েছে মাহবুবের পরিবারকে। তার মৃত্যু বদলে দিয়েছে পুরো পরিবারের জীবনচিত্র।

মাহবুবের বাড়ি কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামে। ফুলবাড়ি গ্রামে মাহাবুবের বাবা-মা আর পরিবারের অন্য সদস্যদের খোঁজ রাখেন না কেউ।

তিনি নেত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের একজন। ২১ আগস্ট, কি যেন কারনে নেত্রী মাহবুব প্রতি ভীষন মনঃক্ষুন্ন ছিলেন। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সমাবেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নেত্রী যখন সুধাসদনের দ্বোতলার সিঁড়ি থেকে নিচে নামছেন,ঠিক তখনি সামনে উপস্থিত হলেন মাহবুব। নেত্রী সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছেন আর রাগতস্বরে মাহবুবকে বলছেন--"তুমি আজকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে যাবে না।আমি যেন তোমাকে সেখানে না দেখি।" শুনে মাহবুব ভাই মাথা নিচু করে শাসন মেনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

নেত্রীর গাড়ি রওনা দেওয়ার সাথে সাথেই দ্রুতবেগে মাহবুব বেরিয়ে গেলেন। চুপিসারে নেত্রীর দৃষ্টির আড়ালে তিনিও পৌঁছিলেন সমাবেশ মঞ্চের নিকটে।

গ্রেনেড হামলা শুরুর সাথে সাথে জানবাজি রাখা নেতৃবৃন্দের সাথে মানববুহ্য তৈরী করে নেত্রীকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে গাড়িতে তুলে দেবার প্রাক্কালে নেত্রীকে টার্গেট করে ছোঁড়া ঘাতকদের গুলি এসে লাগে মাহবুব ভাইয়ের গায়ে।নেত্রী বেঁচে গেলেন, প্রান দিলেন মাহবুব ভাই।

সেদিন নিজের প্রানের বিনিময়ে মাহবুব ভাই বাঁচালেন গণতন্ত্রের মানসকণ্যাকে, বাঁচালেন দূঃখিনী বাংলার দিনবদলের নেত্রীকে।বাঁচালেন প্রিয় মাতৃভূমিকে।

মাহবুবকে নিয়ে গর্ব, অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই আর কান্নায় গাল ভাসানো ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই পরিবারের। বাবা হারুন মোল্লা ছেলে হারানোর শোক আর বয়সের ভারে নেতিয়ে পড়েছেন।
নিহত মাহবুবের দুই ভাই মামুন অর রশীদ ও শাহজাহান আলীকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি বেসরকারি হোটেল ও গার্মেন্টসে চাকরি দিলেও সেখানে ভালো কিছু করতে না পেরে চাকরি ছেড়ে আবার খোকসায় ফিরে আসেন।

এক ভাই অটোরিকশা চালিয়ে সংসারের হাল ধরে। আরেক ভাই মামুন অর রশীদকে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। মাহবুবের স্ত্রী আসমা বেগম ২ সন্তান নিয়ে ঢাকায় থাকেন। যোগাযোগ নেই মাহবুবের বাবা-মায়ের সঙ্গে।

মাহবুবের অসহায় মা হাসিনা বেগম বলেন, ''এই মাস (আগস্ট) আসলিই কেবল সামবাদিকরা আইসে আরো আমাগো জ্বালা বাড়ায় দেয়। কেউ কি আমার ছেলেকে আইনে দিতি পারবা। আমার কেউ তালাশ নেয় না, আমি কিরম আছি। যা যাওয়ার তো আমারই গ্যাছে আপনারা কি ফিইরি দিতি পারবেন।''
মাহবুবের বৃদ্ধ বাবা হারুন-অর-রশিদ বলেন, ''আমি যেন মাহবুবসহ সেই হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার দেখে যেতে পারি'' এ সময় তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, ''দলীয় নেতাকর্মীরা আমাদের পরিবারের কোনো খোঁজ-খবর রাখে না।''

হামলার কিছুদিন আগে মাহবুবকে একটি ঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন নেত্রী শেখ হাসিনা। কয়েক দিন ব্যবহার করে স্মৃতিস্বরূপ মায়ের কছে রেখে দেন তার শহীদ সন্তান। আগস্টের ২১ আসলেই মা ঘড়িটি বুকে চেপে কেঁদে ওঠেন আর মাঝে মাঝে মূর্ছা যান।

মাহবুবের ছোট ভাই শাহজাহান বলেন, ''আমার ৫ বোনের মধ্যে ৩ বোনের বিয়ে দিয়েছি মাহবুব থাকতেই। তারপর অবিবাহিত দুই বোনের বিয়ের ভার নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাত্রপক্ষ এসে আমার ছোট বোন শিরিনাকে দেখে পছন্দ করে গেলেও অর্থাভাবে তার বিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি।''

মাহবুবের ছোট বোন বিউটি বলেন, ''আমাদের দুই বোনের পড়ালেখার জন্য প্রতিমাসে ১ হাজার টাকা করে দিতো বঙ্গবন্ধু কল্যাণ ট্রাস্ট। কিন্তু সেই টাকাও আসা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আমরা এখন লেখাপড়াও করতে পারছি না।''

এ সময় তিনি আরও বলেন, ''স্থানীয় এমপি আব্দুর রউফ কয়েকবার আমাদের ভিজিএফ কার্ড করে দেওয়ার আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করেননি।''

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন বলেন, ''গ্রেনেড হামলায় নিহত মাহবুবের এক ভাইকে খোকসা উপজেলা পরিষদে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছি। যাতে করে তাদের সংসারটা ঠিকমতো চালাতে পারে।''