অপরাধ ও দুর্নীতি ২ নভেম্বর, ২০২২ ০৩:০৪

যে কারণে সম্পাদক কাজী এরতেজার রিমান্ড?

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি বিভিন্ন অফিস, বিশেষ করে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ব্যবহার করে জাল দলিল তৈরি করতেন দৈনিক ভোরের পাতার সম্পাদক প্রকাশক . কাজী এরতেজা হাসান। জাল জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা দলিলে কে সই করেছেন তাকে গ্রেফতারসহ মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য এরতেজাকে দুদিনের রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।

বুধবার ( নভেম্বর) তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর পিবিআইয়ের উপ-পরিদর্শক মো. মেহেদী হাসান চার কারণে দুদিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোশাররফ হোসেন আদালতে রিমান্ড শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

যে চার কারণে রিমান্ড চাওয়া হয়েছে-

এক. আসামি সরকারি বিভিন্ন অফিস বিশেষ করে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ব্যবহার করে জাল দলিল তৈরি করেন। তাকে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার সহযোগী অন্য আসামিদের নাম ঠিকানা সংগ্রহ মাধ্যমে গ্রেফতার করা যাবে।

দুই. তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার সঙ্গে বাড্ডা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত আছেন কি না তা শনাক্ত করা যাবে।

তিন. জাল জালিয়াতির মাধ্যমে সৃজন করা দলিলে কে সই করেছেন ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করে গ্রেফতার করা যাবে।

চার. সর্বোপরি মামলার ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন করার লক্ষ্যে আসামিকে পুলিশ রিমান্ডে পাওয়া একান্ত প্রয়োজন। আসামির নাম ঠিকানা যাচাই করা হয়নি। মামলাটি তদন্তাধীন।

জালিয়াতি প্রতারণার একটি মামলায় মঙ্গলবার ( নভেম্বর) রাতে রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে এরতেজা গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একটি দল।

জানা যায়, আশিয়ানের সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্দার্ন ইউনিভার্সিটির জমি নিয়ে বিরোধ। রাজধানীর ফার্মগেটে যে ভবনে ভোরের পাতার কার্যালয়, সেখানেই আগে নর্দার্ন ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস ছিল।

আশিয়ানের মামলায় নর্দার্ন ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহকে এর আগে গ্রেফতার করেছিল পিবিআই। রিয়াজুল আলম নামে আরেকজনকেও গ্রেফতার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কাজী এরতেজাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি রাজধানীর খিলক্ষেত থানায় মামলাটি করেন আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের ভাই সাইফুল ইসলাম ভুঁইয়া। তিনি আশিয়ান ল্যান্ডস ডেভেলপমেন্টসের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি)

মামলার এজাহারে বাদী অভিযোগ করেন, ২০০৫ সাল থেকে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা করে আসছি এবং ডিএমপি দক্ষিণখান থানার অন্তর্গত বিভিন্ন স্থানে আমার প্রজেক্ট চালু আছে। আমার বন্ধু কাজী শামীম মাহদী ইলেক্ট্রনিক প্রিন্ট মিডিয়ায় কাজ করার সুবাদে আমার সঙ্গে সু-সম্পর্ক গড়ে উঠে। তিনি তার পরিচিত বিভিন্ন ব্যক্তিকে আশিয়ান ল্যান্ডস ডেভেলপম্যান্ট প্রজেক্টে প্লট বুকিংয়ের ব্যবস্থা করে দেন। ২০১০ সালের শুরুতে কাজী শামীম মাহদী আমাকে বলেন, তার পরিচিত একজনের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এবং তারা তাদের ক্যাম্পাসের জন্য জমি খুঁজছেন।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১০ সাল থেকে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের নিজস্ব ক্যাম্পাস স্থাপন করার তাগিদ দিয়ে আসছে। তার পরিচিত ব্যক্তির ক্যাম্পাস অতি দ্রুত স্থানান্তরের জন্য স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে। স্বল্পসময়ের মধ্যে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস স্থাপন করতে ব্যর্থ হলে কার্যক্রম বন্ধ করার সম্ভাবনা রয়েছে।

তখন কাজী শামীম মাহদী জানান, আপনাদের অনেক জায়গা আছে, একটা জায়গা তাদের স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য চান। ২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে একদিন আমার অফিসে কাজী শামীম মাহদী মামলার প্রথম আসামি আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহসহ দুই-তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে আসেন।

তিনি জানান, দক্ষিণখান এলাকার আশিয়ান সিটির সাইট ভিজিট করে তারা জানায়, পাঁচ বিঘা জমি লাগবে। তারা দক্ষিণখান মৌজার মহানগর জরিপ দাগ নম্বর-২৬৮০৪, ২৬৮১৬, ২৬৪৮৬, ২৬৪৮৫, ২৬৪৮৭, ২৬৮০৮ এবং ২৬৪৮৯ পছন্দ করেন। আলাপ-আলোচনার পর জায়গার মূল্য ৫০ কোটি টাকা নির্ধারণ করি। ২০১৩ সালের আগস্ট তিনশত টাকার নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে খিলক্ষেত থানার আশিয়ান মেডিকেল কলেজে অবস্থিত আমার বড় ভাই নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার ব্যক্তিগত অফিসে দুপক্ষের সম্মতিতে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়।

চুক্তিপত্রে প্রথম পক্ষ হিসেবে মামলার এক নম্বর আসামি আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ জমির ক্রেতা এবং দ্বিতীয় আসামি মো. রিয়াজুল আলম সাক্ষী হিসেবে সই করেন।

চুক্তিপত্রে উল্লেখ আছেজমির দামের সম্পূর্ণ টাকা ওই বছরের ৩০ আগস্টের মধ্যে পরিশোধ করতে প্রথম পক্ষ বাধ্য থাকবেন। কিন্তু উল্লিখিত সময়ের মধ্যে নির্ধারিত ৫০ কোটি টাকার মধ্যে নগদে ৩০ কোটি টাকা পরিশোধ করেন এবং বাকি ২০ কোটি টাকা বাকি রাখেন। বাকি টাকা পরিশোধে সময় চান তারা। প্রথম আসামি বলেন, আমরা কাজ শুরু করে স্বল্পসময়ের মধ্যেই বাকি টাকা পরিশোধ করে দেবো।

মামলার বাদী আরও বলেন, আমি সরল বিশ্বাসে তাদের কাজ শুরু করার অনুমতি দিই। কাজ শুরুর পর থেকে বিভিন্নভাবে কালক্ষেপণ করতে থাকেন এবং টাকা পরিশোধ না করে বিভিন্ন বাহানা করতে থাকেন। এভাবে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েও অপরিশোধিত টাকা পরিশোধ করেননি। পরে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ চলমান থাকা অবস্থায় আমার জমি বিক্রির পাওনা টাকা চাইলে ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ জানান, আমি নাকি কোনো টাকা তাদের কাছে পাবো না। কারণ আমার বড় ভাই নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে জমিটি রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন এবং তারা জমির দাম বাবদ সম্পূর্ণ টাকা আমাদের পরিশোধ করেছেন।

সাইফুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, আমার বড় ভাইয়ের (নজরুল ইসলাম) সঙ্গে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলে তিনি হতবাক হয়ে যান এবং বলেন এটা কী করে সম্ভব? জমি রেজিস্ট্রির বিষয়ে আমার বড় ভাই কিছুই জানেন না। এছাড়া তিনি নিজেও কয়েকবার অপরিশোধিত টাকা পরিশোধ করার জন্য তাগাদা দিয়েছেন।

পরবর্তীসময়ে আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, আমরা প্রথম আসামি ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহর কাছে জমি বিক্রি করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলাম। সেই জমিটি রেজিস্ট্রিকৃত সাফ-কাবলা দলিল নম্বর-১১৩৫৩, যা ২০১৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর মূলে রেজিস্ট্রি হয়। জমির মূল্য কোটি ৩৩ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। ওই দলিলের রেজিস্ট্রি সম্পাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও জানতে পারি, দলিলটি কমিশনিংয়ে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে এবং দলিল সম্পাদনকারী মোহরার হিসেবে আমার অফিসের মোহরার শহিদুল ইসলামের নাম রয়েছে। আমার মোহরার শহিদুল ইসলামকে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, তিনি রকম কোনো দলিল লেখার কাজ করেননি।

মামলার বাদী আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের ভাই সাইফুল ইসলাম ভুঁইয়া আরও বলেন, আমি ওই দলিল সম্পর্কে নম্বর আসামির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানান, নর্দার্ন কর্তৃপক্ষ টাকা পরিশোধ করেই আপনার জমি রেজিস্ট্রি করেছে। আমি বারবার নর্দার্ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, বিষয়ে আমি যেন বেশি বাড়াবাড়ি না করি। এছাড়া আমাকে বিভিন্ন সময়ে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেয়। প্রথম আসামি ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ আমার বড় ভাই নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার সই, অফিসের সিল মোহার মো. শহিদুল ইসলামের সই জাল করে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে জমি দলিলের রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।

 

 

 

 

আমাদের কাগজ/টিআর