রায়হান শোভন
হাসপাতালের এলাকা হিসেবে পরিচিত রাজধানীর ধানমন্ডি। এখানকার হাসপাতালগুলো ইট-পাথরের দেয়াল ও কাঁচের প্রাচীরের চাকচিক্যে ঘেরা। এসব হাসপাতালে চিকিৎসা করতে লাগে কারি কারি টাকা। তাই দরিদ্র ও খেটে খাওয়া শ্রেণীর মানুষ এ এলাকায় চিকিৎসা করানোর কথা চিন্তাও করতে পারে না।
তবে এই অভিজাত এলাকায় সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্য নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করেছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। হাসপাতালটি রাজধানীর মিরপুর রোডে ল্যাব এইড হাসপাতালের পাশে অবস্থিত। হাসপাতালটির অবস্থান ধানমন্ডিতে হওয়ায় অনেকেই অর্থনৈতিক দৈন্যতা ও সংকোচে হাসপাতালটির দিকে পা বাড়াতে সাহস পান না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নামমাত্র মূল্যে এ হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন রিক্সাচালক, ভিক্ষুক থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চশ্রেণীর লোকেরাও। তবে এখানে চিকিৎসা নেয়ার পূর্বে সামাজিক শ্রেণী বিবেচনায় স্বাস্থ্য বীমা করতে হয়। নিবন্ধনকৃত রোগীরা এখান থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে যারা নিবন্ধনকৃত রোগী নন তাদেরও ফিরিয়ে দেয়া হয় না। অনিবন্ধিত রোগীরাও অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম খরচে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারেন।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে স্বাস্থ্য বীমা নিবন্ধন প্রক্রিয়াঃ হাসপাতালে ঢুকেই বরাবর স্বাস্থ্য বীমা নামের একটি বুথ আছে। সেখান থেকে ফরম নিয়ে স্বাস্থ্য বীমার জন্য নিবন্ধন করতে হয়। সামাজিক শ্রেণীর ভিত্তিতে ঢাকা, সাভার ও টঙ্গীতে বসবাসরত লোকেরা একক অথবা পরিবারের জন্য বাৎসরিক এ বীমা করতে পারবেন। অতি দরিদ্র একক অধূমপায়ী লোকের একক ও পারিবারিক বীমার পরিমাণ যথাক্রমে ১০০ ও ২০০ টাকা। অতি দরিদ্র ধূমপায়ী লোকের একক ও পারিবারিক বীমার পরিমাণ বছরে ১২৫ ও ২২৫। দরিদ্র অধূমপায়ী লোকের একক ও পারিবারিক বীমা যথাক্রমে ৫০০ ও ১৫০০ টাকা। দরিদ্র ধূমপায়ী লোকের একক ও পারিবারিক বীমা যথাক্রমে ৬০০ ও ১৮০০ টাকা। অধূমপায়ী নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য একক ও পারিবারিক বীমার পরিমাণ ৭৫০ ও ২০০০ টাকা। ধূমপায়ী নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য একক ও পারিবারিক বীমার পরিমাণ ৮০০ ও ২৫০০ টাকা। মধ্যবিত্ত অধূমপায়ী ব্যক্তির একক ও পারিবারিক বীমার পরিমাণ ১০০০ ও ২৫০০ টাকা। অন্যদিকে ধূমপায়ী মধ্যবিত্ত লোকের জন্য একক ও পারিবারিক বীমার পরিমাণ ১২০০ ও ২৮০০ টাকা। উচ্চ-মধ্যবিত্ত অধূমপায়ী লোকের একক ও পারিবারিক বীমার পরিমাণ ১৫০০ ও ৩০০০ টাকা। তবে উচ্চ-মধ্যবিত্ত ধূমপায়ী ব্যক্তির একক ও পারিবারিক বীমার পরিমাণ ১৭০০ ও ৩৫০০ টাকা। অধূমপায়ী ধনী ব্যক্তিদের এক ও পারিবারিক বীমার পরিমাণও ১৭০০ ও ৩৫০০ টাকা। অন্যদিকে ধূমপায়ী ধনী ব্যক্তিদের একক ও পারিবারিক বীমার পরিমাণ ১৮০০ ও ৪০০০ টাকা। উল্লেখ্য গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে পারিবারিক স্বাস্থ্য বীমা করলে আলাদা করে একক স্বাস্থ্য বীমার কোনো প্রয়োজন নেই। তবে কেউ যদি একক বীমা খুলেন সে ক্ষেত্রে বীমায় নিবন্ধনকৃত ব্যক্তিই শুধুমাত্র এই সুবিধার আওতাধীন থাকবেন। তবে পারিবারিক বীমার ক্ষেত্রে পরিবারের সবাই গণস্বাস্থ্য থেকে নিবন্ধিত শ্রেণী অনুযায়ী চিকিৎসা সেবা পাবেন। তবে এক্ষেত্রে আপনি ধনী কিংবা দরিদ্র যে শ্রেণীর হোন না কেন সবার জন্য চিকিৎসার মান সমান।
আইসিইউ'র খরচঃ স্বাস্থ্য বিমার নিবন্ধনকৃত রোগীদের কাছ থেকে আইসিইউ'র খরচ বাবদ অতি দরিদ্রদের ৫০০০ টাকায়, দরিদ্রের ১০ হাজার টাকায়, নিম্ন মধ্যবিত্ত রোগীদের ১৩ হাজার টাকায়, মধ্যবিত্তদের ১৭ হাজার টাকায়, উচ্চ মধ্যবিত্তদের ২০ হাজার টাকায় ও ধনী রোগীদের ২২ হাজার টাকায় আইসিইউ সেবা দেয়া হচ্ছে। তবে যাদের স্বাস্থ্য বিমা নেই তাদের কাছে থেকে প্রতিদিন ২৫ হাজার টাকা নেয়া হচ্ছে।
ডায়ালাইসিসের খরচঃ সামাজিক শ্রেণী বিবেচনায় অতি দরিদ্রদের কাছ থেকে প্রতি ডায়ালাইসিসে ৭০০ টাকা, দরিদ্রদের কাছ থেকে ৯০০, নিম্ন-মধ্যবিত্তদের কাছ থেকে ১১০০, মধ্যবিত্তদের কাছ থেকে ১৫০০, উচ্চ মধ্যবিত্তদের কাছ থেকে ২৫০০, ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে ৩০০০ ও স্বাস্থ্য বীমায় অনিবন্ধিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে ৩৫০০ টাকা রাখা হয় প্রতি ডায়ালাইসিসে। এছাড়াও গণস্বাস্থ্য ডায়ালাইসিস কেন্দ্র থেকে বর্তমানে ৯৩ জন বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ডায়ালাইসিস সেবা পাচ্ছেন। এ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ জন কিডনি রোগী ডায়ালাইসিস সেবা গ্রহণ করেন।
এছাড়াও জেনারেল মেডিসিন, নেফ্রলজি, কার্ডিওলজি, সাইকিয়াট্রিক, জেনারেল সার্জারী, শিশু সার্জারী, শিশু ও নবজাতক, দন্ত বিভাগ, চক্ষু বিভাগ, নাক-কান-গলা বিভাগ, গাইনি এন্ড অবস, অর্থোপেডিক্স, ফিজিওথেরাপি, আয়ূর্বেদ, আকুপাংচার, চর্ম ও যৌন সহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা সুলভ মূল্যে করা হয়।
রাজধানীর রায়ের বাজার থেকে চিকিৎসা নিতে আসা সেতারা বেগম আমাদের কাগজকে বলেন, আমরাতো গরীব মানুষ অতো টাকা পয়সা নেই। এ হাসপাতালে কম খরচে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায়।
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থেকে স্বামীকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য এসেছেন শিউলি রাণী দাস। তিনি আমাদের কাগজকে বলেন, আমরা আগে গ্রামে চিকিৎসা নিতাম। সেখানে আমার স্বামীর রোগ চিকিৎসার নির্ণয় করতে না পারায় আমাদের এ হাসপাতালে পাঠিয়েছে। এ হাসপাতালের খরচ মোটামুটি অনেক কম।
ধানমন্ডির অন্যান্য হাসপাতালগুলোতে যেখানে কারি কারি টাকা নিয়ে ছোটাছুটি হয় সেখানে গণস্বাস্থ্য কীভাবে এত কম টাকায় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করে এমন প্রশ্নের জবাবে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আমাদের কাগজকে বলেন, অন্যান্য হাসপাতালে চিকিৎসার সাথে ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত তাই তারা মানুষের কাছ থেকে গলাকাটা বিল রাখছেন। তিনি বলেন, গণস্বাস্থ্য একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান। এখানে চিকিৎসা নিতে আসা ৮৫ শতাংশ লোকই দরিদ্র শ্রেণীর। তাই আমরা নামমাত্র টাকায় ভালো মানের চিকিৎসা দিয়ে থাকি।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গাইনি এন্ড অবস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. কোহিনুর আমাদের কাগজকে বলেন, আমাদের হাসপাতালটি মানুষদের সেবা দেয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি। অন্যান্য হাসপাতালে রোগীদের জিম্মি করে সিজারিয়ান ডেলিভারিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। কিন্তু আমরা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে মা ও শিশুর মঙ্গলের জন্য নরমাল ডেলিভারি করে থাকি। এখানে নরমাল ডেলিভারির খরচ সামাজিক শ্রেণীর বিবেচনায় মাত্র ১ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে।
উল্লেখ্য, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র বাংলাদেশের একটি বেসরকারি সাহায্য সংস্থা। যেটির কর্মসূচির ভিত্তি স্বাস্থ্য সেবার উপর নির্ভরশীল। স্বাধীন বাংলাদেশে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হচ্ছে প্রথম স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা হাসাপাতাল। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল ঢাকার ইস্কাটন সড়কে পুনঃস্থাপিত হয়। পরবর্তিতে ১৯৭২ সালের এপ্রিলে গ্রামকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুরূপে গড়ে তোলার জন্য চল গ্রামে যাই এই স্লোগান ও উদ্দেশ্য নিয়ে হাসপাতালটি সাভারে স্থানান্তরিত হয়। তখন নামকরণ করা হয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।






















