আন্তর্জাতিক ৩১ অক্টোবর, ২০১৯ ১০:৫৪

অনিশ্চয়তায় ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ।।

ইসরায়েলের নেতৃত্ব বদলের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই ইসরায়েলের ক্ষমতায় পরিবর্তন এলে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে প্রশ্ন এসে যায়। যদিও বলা যায়, ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে দখলদার ইসরায়েলের জন্মের পর যত দিন গেছে, ততই ফিলিস্তিনিদের ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলে ক্ষমতার পালাবদলে সেই পরিস্থিতির তেমন কোনো হেরফের হয়নি।

চলতি বছরের এপ্রিলে ইসরায়েলে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট সরকার গঠন করতে পারেনি। তাই গত ১৭ সেপ্টেম্বর আবারও পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোটগ্রহণ করা হয়। এই নির্বাচনেও কোনো দল বা জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ইতিমধ্যে দেশটির কট্টরপন্থী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জোট সরকার গঠনে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গানৎজ সরকার গঠনের তোড়জোড় শুরু করেছেন। গানৎজ এতে সফল হলে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী কট্টর ইহুদিবাদী নেতানিয়াহুর পতন হবে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন বলছে, সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় নেতানিয়াহু ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থন নিয়ে ৫৫টি আসন জোগাড় করতে পেরেছিলেন। কিন্তু সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আর ছয়টি আসন কোনোভাবেই জোগাড় করতে পারেননি। এটাও আশার কথা গানৎজের জন্য। কারণ নেতানিয়াহুকে সমর্থন না দেওয়া পার্লামেন্টের বাকি ৬৫ আসনের নেতাদের সমর্থন আসার সম্ভাবনা গানৎজের দিকেই। এর মধ্যে নিজ দলে ৩৩ ও জয়েন্ট লিস্টের ১৩ আসন মিলে ৪৬ আসন নিশ্চিত হয়েই আছে।

কিন্তু গানৎজ যদি নেতানিয়াহুকে ঝেঁটিয়ে বিদায় দিতে পারেন, তাতে ফিলিস্তিনিদের কি কোনো লাভ বা ক্ষতি হবে? ফিলিস্তিন নিয়ে তাঁদের অবস্থান কী? রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নেতানিয়াহুকে ডানপন্থী ও ইহুদিবাদী, সেই তুলনায় গানৎজকে মধ্যপন্থী বলে বিবেচনা করা হয়।

বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নেতানিয়াহু কোনোভাবেই সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে নন। তিনি বলেছেন, অন্যান্য দেশের মতো সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র কখনোই তিনি মেনে নেবেন না। আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নেতানিয়াহু অঙ্গীকার করেছেন, পশ্চিম তীর ও জর্ডান উপত্যকায় ইহুদি বসতি সম্প্রসারিত করবেন।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপন অবৈধ। ফিলিস্তিনিরা বারবার বলে আসছে, পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করে তুলবে। ইসরায়েলের এই একগুয়েমি শান্তিপ্রক্রিয়াকে শেষ করে দেবে।

এদিকে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেননি গানৎজ। কিন্তু পশ্চিম তীর ও জেরুজালেম প্রশ্নে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর অমিল নেই। গানৎজ বলেছেন, পশ্চিম তীর থেকে ইহুদি বসতি প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেবেন না তিনি। জেরুজালেমকেও ভাগ করতে দেবেন না।

স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্ন ফিলিস্তিনিরা দেখেন, তাতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করার পরিকল্পনা তাদের। টাইমস অব ইসরায়েলে প্রকাশিত জয়েন্ট লিস্টের নির্বাচনী অঙ্গীকারেও পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েল অধিকৃত এলাকায় গড়ে তোলা ইহুদি বসতিও সরিয়ে ফেলা ও ইসরায়েলের কারাগারে থাকা ‘রাজবন্দী’ ফিলিস্তিনিদের মুক্ত করারও করার কথা বলেছে জয়েন্ট লিস্ট।

সে ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু বা গানৎজ, ফিলিস্তিনিদের কাছে দুজনেই তো প্রায় একই। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার দাবিতে কট্টরপন্থী সংগঠন হামাস এমনটাই মনে করে। হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর চেয়ারম্যান আবু মারজুক আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাদের চোখে নেতানিয়াহু বা গানৎজের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ইসরায়েলে নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ইহুদিবাদী ও কট্টর জাতীয়তাবাদীদের উত্থান ঘটছে। এরা ইসরায়েলের দখলদারি বজায় রাখার পক্ষে। আবু মারজুক আরও বলেন, ২০১৪ সালে গাজায় আগ্রাসন চালিয়ে ইসরায়েল ২০০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে। তখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে নেতানিয়াহু আর সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন এই গানৎজ।

হামাস নেতার বক্তব্যে ফিলিস্তিনিদের ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে পড়ার আশঙ্কাই প্রকাশ পায়। তবে জয়েন্ট লিস্টের সমর্থন নিয়ে গানৎজ সরকার গঠন করলে সেই সরকারে আরব দলগুলোর প্রভাব থাকবে। এমনকি সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়ে সরকার পতন ঘটানোর ক্ষমতাও থাকবে তাদের। সে ক্ষেত্রে তারা যদি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনে ইতিবাচক কোনো আলোচনা শুরু করতে পারে, সেটা হবে দারুণ এক বিষয়।