জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯) নৃশংসভাবে হত্যার তদন্তে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কড়া বার্তা দিতেই দোকানে হত্যা না করে মিটফোর্ডের সামনে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পিটিয়ে, ইট-পাথর ছুড়ে হত্যার পর বুকের ওপর দাঁড়িয়ে করা হয় বুনো উল্লাস।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সূত্র আরও জানায়, মহিন মাসে ফিক্সড চাঁদা চাওয়ায় বেঁকে বসেন সোহাগ। আর এটি নিয়েই দীর্ঘদিনের দুই বন্ধু শত্রুতে পরিণত হয়। মূলত মহিন ও টিটন গাজী পরিকল্পনা করেন সোহাগকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে ফেলার। তাদের ধারণা ছিল- ভাঙারি দোকানে অনেক লাভ। সোহাগকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিলে ‘সোহানা মেটাল’ নামে দোকানটি তাদের হয়ে যাবে এবং পুরো এলাকার ভাঙারি ব্যবসা তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
মহিন গ্রুপ মিটফোর্ডে অ্যাম্বুলেন্স চালকদের কাছ থেকে মাসে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা নিতো। সম্প্রতি আমার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার সাড়ে তিন হাজার টাকা পাওনা রাখে মহিন গ্রুপের ছোট মনির। ওই টাকা চাওয়ায় আমাকে গত ২৩ জুন মারধর করা হয়। আমরা মহিন গ্রুপের সবার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি।-স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স চালক
• ভাঙারি দোকানটি দখল করতে চেয়েছিল মহিন
• ছোট মনিরের মাধ্যমে অস্ত্রও সংগ্রহ করে রবিন
• পুরোনো ক্ষোভ ছিল খুনিদের মধ্যে দুজনের
জানা যায়, রজনী বোস লেনের কিছুটা ভেতরে সোহাগের দোকান। গত ৭ জুলাই চাঁদা নেওয়ার বিষয়ে সোহাগ ও মহিনের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতির মতো ঘটনা ঘটে। বিষয়টি জানতে পেরে সোহাগের সঙ্গে যোগাযোগও করে পুলিশ। তখন সোহাগ জানান, মহিনের সঙ্গে ঝামেলা মিটে গেছে। কিন্তু মহিন চুপচাপ বসে থাকেনি। ওইদিনই হত্যার পরিকল্পনা করে টিটনের সঙ্গে।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মহিন তদন্ত সংশ্লিষ্টদের জানান, সোহাগ খুবই একরোখা স্বভাবের ছিল। এজন্য তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়। শুরুতে তাকে দোকানেই হত্যার পরিকল্পনা ছিল। এজন্য অস্ত্রও সংগ্রহ করা হয় ছোট মনিরের মাধ্যমে। কিন্তু তারা সাম্প্রতিক ‘মব’ দেখে উৎসাহিত হয়। তাদের ধারণা ছিল- সোহাগকে যদি মিটফোর্ডের ৩ নম্বর গেটের সামনে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে অনেকে মিলে উল্লাস করা যায় তাহলে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেবে। আর অত্র এলাকার ভাঙারি ব্যবসায়ী, অন্য ব্যবসায়ী, অ্যাম্বুলেন্স চালক, রেস্টুরেন্ট, ফার্মেসি ও ফুটপাতের দোকানগুলোতে অটোমেটিকলি কড়া বার্তা চলে যাবে মহিন গ্রুপের কথা না শুনলে পরিণতি হবে এরচেয়েও ভয়াবহ।
তিন মাস আগে সোহাগ এ দোকানটি ভাড়া নিয়েছিল। আগে পাশেই অন্য গলিতে দোকান ছিল। বুধবার দোকানে আসার পাঁচ মিনিটের মধ্যে মহিন গ্রুপ মোটরসাইকেলে এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়। ভবিষ্যতে মহিন গ্রুপের অন্যরা এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে না- এর নিশ্চয়তা কে দেবে?- একটি ভাঙারি দোকানের মালিক
এই চিন্তা থেকেই গত বুধবার সোহাগ দোকানে আসার পরেই সাতটি মোটরসাইকেলে করে ১৯ জন মিলে রজনী বোস লেনে প্রবেশ করে হামলাকারীরা। এরপর সোহাগকে মারধর করতে করতে মিটফোর্ড হাসপাতালের গেটের সামনে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে ইট-বালু-সিমেন্টের তৈরি পাথর সদৃশ কংক্রিট দিয়ে বারবার আঘাত হত্যা করা হয়। এরপর ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ালে মরদেহ টেনেছিঁচড়ে গেটের বাইরে এনে উল্লাস করা হয়।
এদিকে খুনিদের মধ্যে পুরোনো ক্ষোভ ছিল দুজনের। এদের মধ্যে একজনের কপালে একটি কাটা দাগ রয়েছে। ওই দুই খুনি পুলিশকে জানিয়েছেন, সোহাগ রগচটা ও একরোখা মানুষ ছিল। মতের অমিল হলেই গায়ে হাত দিয়ে বসতো। কয়েকবছর আগে সোহাগ তাদের মারধর করে। কপালের কাটা দাগটি সোহাগের মারের কারণেই। পুরোনো পুঞ্জিভূত এ ক্ষোভ থেকেই তারা সোহাগকে মারধর করে। তারা ভেবেছিল- উপস্থিত খুনিদের মধ্যে যুবদল ও বর্তমানে প্রভাবশালী আরেকটি রাজনৈতিক দলের লোকজন থাকায় হত্যাকাণ্ড অন্যভাবে ধামাচাপা পড়ে যাবে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অন্য আসামিদের গ্রেফতারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। আশাকরি দ্রুত সময়ের মধ্যে এ ঘটনায় জড়িত সবাইকেই আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।- কোতয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান
গ্রেফতারদের কাছ থেকে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা এমন তথ্যও পেয়েছেন মহিন, টিটন ও রবিন গেঞ্জাম লাগছে বলে তাদের গ্রুপের সদস্যদের ঘটনার আগে ডেকে এনেছিল। অর্থাৎ, হত্যায় অংশ নেওয়া ১৯ জনের অনেকেই জানতেন না সোহাগকে হত্যা করা হবে। তবে, ভাঙারি দোকান থেকে সোহাগকে মিটফোর্ডে ধরে আনার পর মহিন সবাইকে বলতে থাকে- ও (সোহাগ) বেঁচে থাকলে আমরা সবাই শেষ। এরপরই সবাই সোহাগকে মেরে ফেলতে হামলা চালাতে থাকে।
কোতয়ালি থানার ঊর্ধ্বতন একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বন্ধুর মতো পথচলা সোহাগ এবং খুনিদের অন্যতম মহিন ও টিটনের সাম্প্রতিক সম্পর্ক ভালো ছিল না। অতীতে বিভিন্ন সভা-সভাবেশ উপলক্ষে সোহাগ অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ লোকজনকে মিছিলে পাঠাতো। অনেক সভা-সমাবেশে সোহাগ সক্রিয় ভূমিকা রেখে মহিনকে সহযোগিতা করতো। কিন্তু সম্প্রতি মহিন ফিক্সড টাকা দাবি করে বসে। প্রতি মাসে দুই লাখ টাকা করে চাঁদা দিতে হবে। এটি মানতে পারছিল না সোহাগ।’
তিনি বলেন, ‘সোহাগের যুক্তি ছিল- আমি তো বাইরের কেউ নই। একসঙ্গে সভা-সমাবেশ করি। এরপরও আমার নির্দিষ্ট হারে কেন চাঁদা দিতে হবে। টাকা দিতে আপত্তি নেই- তবে নির্দিষ্ট কোনো টাকা আমি দেবো না। এ কথার পরই তাদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। সবশেষ ৭ জুলাই অনুসারীদের নিয়ে সোহাগকে হুমকি দিতে যায় মহিন। এসময় তাদের মধ্যে ঝামেলা হলে খবর পায় চকবাজার থানা পুলিশ। তখন সোহাগ পুলিশকে জানিয়েছিল- তাদের ব্যক্তিগত সমস্যা মিটমাট হয়ে গেছে।’
রোববার (১৩ জুলাই) দুপুরে সরেজমিনে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটে গিয়ে দেখা যায়, এখনো সেখানে উৎসুক জনতার ভিড়। যারাই ওই এলাকা দিয়ে যাচ্ছেন, তারাই জানতে চাচ্ছেন কোথায় মারা হয়েছিল। স্থানীয়দের কেউ কেউ ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন এবং চাঁদাবজি বন্ধ ও খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন অ্যাম্বুলেন্স চালক বলেন, ‘মহিন গ্রুপ মিটফোর্ডে অ্যাম্বুলেন্স চালকদের কাছ থেকে মাসে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা নিতো। সম্প্রতি আমার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার সাড়ে তিন হাজার টাকা পাওনা রাখে মহিন গ্রুপের ছোট মনির। ওই টাকা চাওয়ায় আমাকে গত ২৩ জুন মারধর করা হয়। একইদিন মিশু নামে আরেক ব্যক্তিকে মারধর করে মহিন গ্রুপের সদস্যরা। তাদের যন্ত্রণায় আমরা অতিষ্ঠ ছিলাম। ২৩ জুনের পর আমাকে আর মিটফোর্ডে ঢুকতে দেয়নি। আমরা মহিন গ্রুপের সবার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি।’
পুরান ঢাকার রজনী বোস লেনের পুরোটা জুড়েই ভাঙারি দোকান। যে স্টাইলে সোহাগকে ধরে এনে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে এতে অনেকটাই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে অন্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তাদের দাবি- এলাকাটিতে মহিনের মতো আরও পাঁচ-ছয়টি গ্রুপ রয়েছে। মহিন গ্রেফতার হলেও অনুসারী ওই গ্রুপগুলো তাদের হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভাঙারি দোকানের মালিক বলেন, ‘তিন মাস আগে সোহাগ এ দোকানটি ভাড়া নিয়েছিল। আগে পাশেই অন্য গলিতে দোকান ছিল। বুধবার দোকানে আসার পাঁচ মিনিটের মধ্যে মহিন গ্রুপ মোটরসাইকেলে এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়। ভবিষ্যতে মহিন গ্রুপের অন্যরা এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে না- এর নিশ্চয়তা কে দেবে?’
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কোতয়ালি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মনির হোসেন জীবন বলেন, ‘অস্ত্রসহ রবিনকে গ্রেফতারের পর সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। রবিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা কাজ করছি।’
আলোচিত এ ঘটনা তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে কোতয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এ ঘটনায় হত্যা ও অস্ত্র আইনে আলাদা দুটি মামলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অন্য আসামিদের গ্রেফতারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। আশাকরি দ্রুত সময়ের মধ্যে এ ঘটনায় জড়িত সবাইকেই আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।’
ডিবির যুগ্ম কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ রবিউল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘এ ঘটনায় ডিবি মামলাটি ছায়া তদন্ত করছে। আসামি যারা আছে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে।’
রোববার দুপুরে সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, পুরান ঢাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে নৃশংসভাবে হত্যা মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মিটফোর্ড এলাকায় ভাঙারি পণ্যের ব্যবসায়ী সোহাগকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা তদন্তে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিচারিক কমিশন গঠনের নির্দেশনা চেয়ে রিট করা হয়েছে। রোববার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ এ রিট করেন।
পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ (৩৯) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আনসার সদস্যদের দায়িত্বে অবহেলার কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ। তিনি বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নির্দেশিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ওই সময় সেখানে কোনো আনসার সদস্য কর্তব্যরত ছিলেন না।
সূত্র: জাগো নিউজ






















