অর্থ ও বাণিজ্য ৯ এপ্রিল, ২০২৩ ০৪:১৮

দেশে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন, বিপাকে ভারত 

আমাদের কাগজ রিপোর্ট: সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বেড়েছে পেঁয়াজের ফলন। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যটি ভারত থেকে আমদানির প্রয়োজন পড়ছে না। এতে ভারতের চাষিরা তাদের উৎপাদিত পেঁয়াজ নিয়ে কিছুটা হলেও বিপাকে পড়েছেন।

কৃষিখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি মাঝেমধ্যেই অনিশ্চয়তার পড়ায় বাংলাদেশে আরও বেশি পেঁয়াজ চাষে জোর দেওয়া হয়। পাশাপাশি ভালো দাম পাওয়ায় বাংলাদেশের কৃষকেরা পেঁয়াজ চাষে ঝুঁকেছেন। তাতে উৎপাদন বাড়ছে। যার ফলে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি কমতে শুরু করেছে।


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ৩৬ লাখ টন। তার আগের বছর দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ছিল ৩৪ লাখ টন। গত ২০১৯-২০ অর্থবছর উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২৬ লাখ টন। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, যেভাবে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে, তাতে এবারও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই সময়ে কৃষক যাতে ন্যায্যমূল্য পান, সে জন্য সরকার আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 


গত ১৫ মার্চ থেকে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করেছে বাংলাদেশের সরকার। পেঁয়াজ আমদানি অনুমোদনের (আইপি) মেয়াদ নতুন করে বাড়ানোর চিন্তা আপাতত সরকারের নেই বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

অন্যদিকে, এ বছর ভারতেও পেঁয়াজের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু রপ্তানি করতে না পারায় চাষিরা পেঁয়াজের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না বলে দাবি দেশটির কৃষক নেতাদের। 

সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বছর ভারতের অন্যতম উৎপাদনকারী এলাকা মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। রপ্তানি চাহিদা না থাকায় পেঁয়াজের দাম এতটাই কমেছে যে কৃষকেরা প্রতি কেজি মাত্র দু-তিন টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এমন অবস্থায় অনেক কৃষক মাঠেই ফসল নষ্ট করছেন। মহারাষ্ট্রের মধ্যপ্রদেশ আর গুজরাটেও একই অবস্থা চলছে।

ভারতীয় কৃষকদের জন্য এ সমস্যা কতটা প্রকট তা জানতে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া মার্ক্সিস্টের (সিপিআইএম) কৃষক সংগঠন অল ইন্ডিয়া কিষান সভার মহারাষ্ট্রের উপসভাপতি সি সুনীল মালুসারের সঙ্গে কথা বলেছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো। 

সি সুনীল মালুসারে বলেন, “নতুন পেঁয়াজ মার্চ-এপ্রিল মাস থেকে আসতে শুরু করে। তখন পুরোনো পেঁয়াজ শেষ হয়ে যায়। ভারতের সরকারি সংস্থা অ্যাগ্রিকালচারাল প্রোডিউস মার্কেট কমিটি বা এপিএমসি যে দামে পুরোনো পেঁয়াজ কিনেছিল, তা কৃষকদের বিরাট সর্বনাশ করেছে। কারণ, উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি ১০ থেকে ১২ টাকার বেশি হলেও, প্রতি কেজি ৪, ৫ বা ৬ টাকা পাওয়া গিয়েছে সরকারের থেকে অনুদান বা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস) হিসেবে।”

তিনি আরও বলেন, “এখন নতুন পেঁয়াজ আসছে। বাজারে পুরোনো পেঁয়াজের তুলনায় নতুন পেঁয়াজ অনেক বেশি মাত্রায় আসে। ইতোমধ্যে হাজার হাজার টন এসেও গেছে। এবার অবশ্য সরকার একটু বেশি দর (কুইন্টালপ্রতি ৮০০ টাকা) দিচ্ছে। কিন্তু যতক্ষণ না প্রতি কুইন্টালে ১ হাজার ২০০ টাকা দেবে, ততক্ষণ কৃষক লাভের মুখ দেখতে পাবেন না।”

এমন অবস্থায় ভারতের কৃষকদের বেসরকারি বাজারের ওপরে নির্ভর করতে হয় উল্লেখ করেন সি সুনীল মালুসারে।

তার ভাষ্য, বেসরকারি বাজারের মধ্যে অন্যতম বাজার হলো বাংলাদেশ। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে পেঁয়াজ নেওয়া বন্ধ করেছে। বাংলাদেশ যদি পুরো মৌসুম পেঁয়াজ না নেয়, তাহলে কৃষক তো বটেই, বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীরাও বড় ক্ষতির মধ্যে পড়বেন।

এদিকে, স্থানীয় উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাংলাদেশে পেঁয়াজের বাজারে এ বছর কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা নেই। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছেঅ। আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। 

অবশ্য বাংলাদেশ যখন পেঁয়াজ আমদানিনির্ভর ছিল তখন পরিস্থিতি এমন ছিল না। এমনও হয়েছে বাংলাদেশের যখন পেঁয়াজের অনেক বেশি দরকার, তখন ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পেঁয়াজের অভ্যন্তরীণ সংকটের আশঙ্কার কথা বলে রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজ কখনো কখনো প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়ও বিক্রি হয়েছে। 

বর্তমানে সেই অবস্থা আর নেই। পেঁয়াজ উৎপাদন এখন লক্ষ্যমাত্রার বেশি। তাতে বাজারে আমদানি না করলেও চলে। তবে পচনশীল পণ্য হওয়ায় উৎপাদনের পুরোটা ব্যবহার করা যায় না। 

জানা গেছে, পেঁয়াজের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে সরকার ইতোমধ্যে কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণ পদ্ধতি আধুনিকায়ন এবং বিপণন কার্যক্রম উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষকদের পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণে সহায়তা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান সম্প্রসারণ। তা ছাড়া বাজার সংযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে কৃষকদের আয় ১০ থেকে ১৫ % বৃদ্ধি করে দারিদ্র্য হ্রাস করা।

কৃষি কর্মকর্তারা বলেছেন, দেশের ১২টি উপজেলায় এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পেঁয়াজ-রসুন সংরক্ষণের জন্য ৩০০টি ঘর নির্মাণের মাধ্যমে ২০২৬ সালের জুন মাসে এই প্রকল্প শেষ হবে।

 

 

 

 

আমাদের কাগজ/টিআর