সম্পাদকীয় ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০২:১৭

হারুন-মামুনের দ্বন্দ্বের ঘটনা পুলিশ-প্রশাসনের ‘প্রলয়কান্ড’ নয়

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক (তুষার আহম্মেদ) : দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে সানজিদা কান্ড ও পুলিশের হাতে ছাত্রলীগের নেতা মারধরের ঘটনা। এত সবের পরে রয়ে গেছে অযাজিত কেন্দ্রীয় ছাত্র নেতাদের নির্যাতন ও গাঁয়ে আঘাতের চিহ্ন। তবে, এতে কি শুধু ব্যক্তি দ্বন্দ্বকে ইঙ্গিত করে নাকি দেশের পুলিশ- প্রশাসনের দিকেও অঙ্গুল উঠেছে? এমন অনেক প্রশ্নের বাসা বেঁধেছে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি পেশাদারিত্বদের নিয়ে। যারা, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার কথা থাকলেও উল্টো গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে
 

যেটি বাংলাদেশের ইতিহাদের বিরল ও একনিষ্ঠ বলে ধরণা করা হচ্ছে। কেন না কোনো সরকারি কর্মচারী তার সহকর্মীকে আঘাত করতে পারেন না। এটা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে। এমন বক্তব্য প্রচার এবং এডিসি হারুনকে বরখাস্তের পর আলোচনায় আসে পুলিশ-প্রশাসন ক্যাডারে বিছন্নতার বহিঃপ্রকাশ। পাশাপাশি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালায় (২০১৮) শাস্তির বিষয়টিও সামনে আসে।

 

ঘটনার সূত্রপাত 
 
রাজধানীর শাহবাগের বারডেম হাসপাতালে। যাকে কেন্দ্র করে এত কিছু ডিএমপির সেই এডিসি সানজিদার দাবি, তার স্বামী রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) আজিজুল হক মামুনই প্রথম এডিসি হারুনের গায়ে হাত তোলেন।

 

তবে, পুলিশ ও প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে সংঘটিত ঘটনাটি ‘কেন্দ্রবিন্দু ’ বলতে নারাজ। বরং তদন্তে যা বের হবে সেটির ভিত্তিতে যার যতটুকু দায় তাকে ততটুকু শাস্তি দেওয়ার দাবি তাদের। 
 

আইনজীবীরা বলছেন, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে বা আইনানুগভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। কেউ যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, সরকারি চাকরির শৃঙ্খলাবিধি আছে। সেই বিধি বা নিয়ম অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ যদি সরকারি নিয়ম ভঙ্গ করেন, সেই বিষয়টি তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখবে।
 

এদিকে, ছাত্রলীগের তিন নেতাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে ব্যাপক মারধরের ঘটনায় বিব্রত ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। 
 

এ ঘটনার জেরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক ও বর্তমান অনেক ছাত্রলীগ নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। নির্বাচনের ঠিক তিন মাস আগে এমন ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে খোদ রাষ্ট্র-সরকারের বিভিন্ন মহল। যাতে বলা যেতেই পারে, 'রথের দড়ির এদিক- ওদিক দুদিকই সমান ' অবস্থায় সরকার। 
ঘনটার পর থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতা বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

 

তবে সূত্র বলছে, পুলিশ, প্রশাসন ক্যাডার ও ছাত্রলীগ— তিন পক্ষকেই শান্ত রাখতে কৌশলী সরকার। পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে তারা।
এ ঘটনা নিয়ে আগাগোড়া ফুলে ফেঁপে -যাচ্ছে বিভিন্ন গণমাধ্যম। হইচই, লেখালেখি ও আলোড়ন তৈরি হয়েছে সমাজের বিভিন্ন মহলে।  

ঘটনার তো তদন্ত হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি তো বলছেন, তদন্তে যা পাওয়া যাবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে পুলিশ ও প্রশাসনের মধ্যে ‘প্রলয়কান্ড’ বা দ্বন্দ্ব দেখার সুযোগ নেই। 
 

প্রসঙ্গত, গত ৯ সেপ্টেম্বর রাতে রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) আজিজুল হকের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে ডিএমপির রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) হারুন-অর রশীদের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের তিন নেতাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে মারধর করা হয়।
 

ব্যাপক সমালোচনার মুখে এডিসি হারুনকে পরের দিন (১০ সেপ্টেম্বর) প্রথমে প্রত্যাহার, পরে দুবার বদলি করা হয়। প্রথমে রমনা থেকে পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম) উত্তরে এবং পরে পুলিশ সদরদপ্তরের এক প্রজ্ঞাপনে এপিবিএনে বদলি করা হয়। এর এক দিন পর আবার রংপুর রেঞ্জে বদলি করা হয় এডিসি হারুনকে। 
 

এ ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটিকে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য প্রথমে দুই দিনের সময় দেওয়া হয়। পরে তা বাড়িয়ে পাঁচ দিন করা হয়। গতকাল (মঙ্গলবার) তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত দিন ছিল। তবে, কমিটি তদন্ত শেষ করতে না পারায় আবারও সাত দিনের সময় চায়। ডিএমপি কমিশনার তিন দিনের সময় মঞ্জুর করেছেন।

 

ডিবি প্রধানের বক্তব্যে সামনে আসে বারডেমের ঘটনা
 

গত ১২ সেপ্টেম্বর নিজ কার্যালয়ে সংবাদিকাদের সঙ্গে আলাপকালে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ বলেছিলেন, ‘ডিএমপির রমনা বিভাগের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এডিসি হারুনের ওপর প্রথমে হামলা হয়েছে। এ ঘটনার সূত্রপাত যে কারণে হয়েছে, যিনি সূত্রপাত করেছেন, তিনিও (রাষ্ট্রপতির এপিএস আজিজুল হক) একজন সরকারি কর্মকর্তা। উনি আমাদের পুলিশের ওপর হামলাটি করেছেন। তিনি তো ইচ্ছা করলে আমাদের (পুলিশ) ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাতে পারতেন। অথবা তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারতেন। সেটি না করে হাসপাতালের ভেতরে অসংখ্য মানুষের সামনে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ধাওয়া করা, তার চশমা ভেঙে ফেলা, তার ওপর আঘাত করা— এটি সঠিক করেছেন কি না, আমি জানি না। তবে, তদন্ত হওয়া উচিত।’

পুলিশ কখনওই কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দায় নেয় না— উল্লেখ করে অতিরিক্ত কমিশনার হারুন বলেন, ‘পুলিশ বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে যারা, যে অপরাধ করছেন, সেই অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আমি মনে করি, এ ঘটনায় তদন্তকারী কর্মকর্তারা স্বাধীনভাবে তদন্ত করছেন এবং করবেন।’
 

হারুন বলেন, নির্যাতন তো আপনি ডাকাতকেও করতে পারেন না। যিনি নির্যাতন করেছেন, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তদন্তেই সবকিছু স্পষ্ট হবে। কারও পারিবারিক বা ব্যক্তিগত বিষয়কে দয়া করে আন্তঃক্যাডারের দ্বৈরথ হিসেবে দেখবেন না
 

এদিকে এপিএস মামুনের স্ত্রী সানজিদা আফরিন ৩৩তম বিসিএসের কর্মকর্তা। এদের মাঝে ছাত্রলীগের দুই নেতা কি ভাবে আসল সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।
ঘটনার বিশ্লেষণ কালে আগুনে ঘি ঢালার মতো বক্তব্য দেন এডিসি সানজিদা। ডিএমপির ক্রাইম বিভাগে অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন তিনি।

 

ওই দিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে গিয়ে সানজিদা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বারডেম হাসপাতালে এডিসি হারুনের উপর আমার স্বামী (এপিএস মামুন) প্রথমে হাত তোলেন।’
 

গত ১২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় এ বিষয়ে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্তাধীন বিষয়ে আমার কথা বলা সমীচীন হবে না। তদন্তেই বেরিয়ে আসবে আসল ঘটনা। এটুকু বলে রাখি, আমিই প্রথম নির্যাতন বা মারধরের শিকার।’
 

অনুমতি ছাড়া কথা বলতে পারেন না সানজিদা 
 

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেছিলেন, অনুমতি ছাড়া ডিএমপির ক্রাইম বিভাগে অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) সানজিদা আফরিনের বক্তব্য দেওয়া ঠিক হয়নি। ডিবি হারুনের বক্তব্যের বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। হারুনের তথ্যের বিষয়ে হারুনই জানেন।
 

নাগরিকের সেবা, নাগরিকের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। তাদের নিজেদের প্রভু ভাবা বা সাজার কোনো সুযোগ নেই। অবজ্ঞা করারও সুযোগ নেই। সেবা করার উদ্দেশ্যেই তাদের কাজ করতে হবে। একইভাবে ছাত্রদেরও নিজ নিজ দায়িত্বের বাইরে পা দেওয়া উচিত নয়
 

সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেছিলেন, অভিযোগ আকারে যদি কেউ কিছু আমাদের দেয়, তাহলে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাব। তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেবে। এ ছাড়া আমরাও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের তদন্তে বিষয়টি উঠে আসলে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাব।
 

এসময় ঘটনার এক বিরিতিতে এপিএস মামুনের দৌড়াত্ব নিয়ে তদন্ত হবে বলে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। 
 

গত (শুক্রবার) এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছিলেন, ‘ছাত্রলীগের তিন নেতাকে থানায় নিয়ে মারধরের ঘটনায় রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) আজিজুল হকের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে। সবই তদন্তে আসবে। কোনোটি বাদ যাবে না। যে-ই ঘটনার সঙ্গে সংযুক্ত হবে, সম্পৃক্ত হবে কিংবা ঘটনার সঙ্গে মানে কোনো অংশে জড়িত থাকবে. সব বিষয়েই তদন্ত হবে। আইন সবার জন্য সমান। তিনি পুলিশ হোক, জনপ্রতিনিধি হোক কিংবা সরকারি কর্মকর্তা হোক। সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।’

 

আইন কী বলছে 
 

‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, নির্যাতন বলতে কষ্ট হয়, এমন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। আইন অনুযায়ী, পুলিশ হেফাজতে কোনো ব্যক্তি যদি নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতে সরাসরি মামলা করতে পারবেন। আবার ভুক্তভোগী ছাড়া তৃতীয় কোনো ব্যক্তি নির্যাতনের বিষয়টি আদালতকে জানাতে পারেন। ভুক্তভোগী না হওয়া সত্ত্বেও তৃতীয় কোনো ব্যক্তি পুলিশ সুপার কিংবা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ জানাতে পারবেন।
 

ওই আইনে বলা আছে, নির্যাতনের অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। যদি নির্যাতনের ফলে কেউ মারা যান, তাহলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার সর্বোচ্চ শাস্তি হবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
 

কেউ যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, সরকারি চাকরির শৃঙ্খলাবিধি আছে, ওই বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। আমার মনে হয় আইন অনুযায়ী বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া ভালো। রেষারেষি হলে যেটি হয়, জনগণের মধ্যে একটি ভুল ধারণা যায়, ভুল বার্তা যায়। এতে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়
 

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খুরশীদ আলম খান যা বলেন 

সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা- ২০১৮ এ ‘অসদাচরণ’-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘অসদাচরণ অর্থ অসংগত আচরণ বা চাকরি শৃঙ্খলার জন্য হানিকর আচরণ, অথবা সরকারি কর্মচারীদের আচরণসংক্রান্ত বিদ্যমান বিধিমালার কোনো বিধানের পরিপন্থি কোনো কার্য, অথবা কোনো সরকারি কর্মচারীর পক্ষে শিষ্টাচার-বহির্ভূত কোনো আচরণ।’
 

সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালায় লঘুদণ্ড ও গুরুদণ্ড রয়েছে। লঘুদণ্ডের মধ্যে তিরস্কার, বেতন বৃদ্ধি অথবা পদোন্নতি স্থগিত ইত্যাদি রয়েছে। গুরুদণ্ডের মধ্যে রয়েছে- নিম্ন পদ বা বেতনের নিম্ন ধাপে নামিয়ে দেওয়া, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অপসারণ ও বরখাস্ত করা।
 

এডিসি হারুন-এপিএস মামুনের দ্বন্দ্ব ‘ব্যক্তিগত’
 

ঘটনাটি ‘বিচ্ছিন্ন ও ব্যক্তিগত’ বিষয় হিসেবেই দেখছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক। তিনি বলেন, ‘মিডিয়াই ঘটনাটি নিয়ে বেশি হইচই, লেখালেখি করছে। ঘটনার তো তদন্ত হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি তো বলছেন, তদন্তে যা পাওয়া যাবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে পুলিশ ও প্রশাসনের মধ্যে দ্বৈরথ বা দ্বন্দ্ব দেখার সুযোগ নেই।’
কেউ মামলা করেনি, জিডিও করেনি। ভুক্তভোগীও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেননি। গণমাধ্যমে আসার পর তবে কেন এডিসি হারুনকে বরখাস্ত করা হলো— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মামুনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার পুলিশের নেই। তিনি কতটুকু অপেশাদার আচরণ করেছেন, সেটি জনপ্রশাসন দেখবে। এডিসি হারুনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার পুলিশের ছিল, সেজন্য তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি যা করেছেন..., অপেশাদার আচরণ ও অপরাধ, যেটি তিনি করতে পারেন না।’

 

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারের মধ্যে দ্বৈরথ বা লাগালাগি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আমি প্রশাসন ক্যাডারে ছিলাম। আমি অনেক ভালো ক্যাডার দেখেছি, অনেক খারাপ লোকও দেখেছি। খারাপের জন্য ব্যক্তি দায়ী। আমি কারও নাম ম্যানশন করছি না। এ ঘটনায় ব্যক্তিই দায়ী। লাগালাগির কোনো ব্যাপার আছে বলে মনে করি না।’

 

প্রশাসন-পুলিশ ক্যাডার দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হলে ক্ষতি সরকারের
 

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘অ্যাডমিন ক্যাডার একটি সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। পুলিশ ক্যাডারও গুরুত্বপূর্ণ। তারা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করেন। এ দুই ক্যাডারের মধ্যে যদি কোনো কন্ট্রাডিকশন (দ্বন্দ্ব) তৈরি হয় এবং তা জনগণের মাঝে দৃশ্যমান হয়, এটি সরকারের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।’
 

‘তাই, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে বা আইনানুগভাবে বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। কেউ যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, সরকারি চাকরির শৃঙ্খলাবিধি আছে, ওই বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। আমার মনে হয় আইন অনুযায়ী বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া ভালো। রেষারেষি হলে যেটি হয়, জনগণের মধ্যে একটি ভুল ধারণা যায়, ভুল বার্তা যায়। এতে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
 

তিনি বলেন, ‘আমার পরামর্শ হলো, আইনিভাবে, বিধিবদ্ধভাবে পুরো বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।’
 

বিষয়টি নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি হওয়া উচিত— মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান। তিনি বলেন, ‘এটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে তারা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। এডিসি হারুন ও রাষ্ট্রপতির এপিএস কেউই কাজটি ঠিক করেননি। পরবর্তীতে শাহবাগ থানায় হারুন যে কাজটি করেছেন সেটির জন্য নিন্দা জানানোর কোনো ভাষা নেই।’
 

তিনি বলেন, ‘তারা তো সাধারণ ছাত্র নন। ছাত্রনেতা, ছাত্রলীগের উচ্চপর্যায়ের নেতা। তারা যদি অন্যায় করে থাকেন, তার জন্য আইন আছে। তাই বলে থানায় নিয়ে এভাবে মারপিট করবেন! ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত।’
 

‘পুলিশ ক্যাডার ও প্রশাসন ক্যাডারের মধ্যে রেষারেষি চলছে’— উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পুরো ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিত। আমি মনে করি, বিচার বিভাগের অধীন তদন্ত হলে ভালো। পুলিশের মধ্যেও অনেক ভালো অফিসার আছেন। যেমন- পুলিশ কমিশনার বলেছেন, সানজিদার সাক্ষাৎকার দেওয়াটা ঠিক হয়নি। তিনি ঠিক বলেছেন। পুলিশ যে কাজটি করেছে তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। পুলিশ যে আইন হাতে তুলে নিয়েছে, এটিরও বিচার হওয়া উচিত। আর রাষ্ট্রপতির এপিএস অ্যাডমিন ক্যাডারের লোক, উনার স্ত্রীকে নিয়ে কোনো নোংরামি করা বা করতে যাওয়া ঠিক নয়। এতে প্রশাসন ক্যাডার বলেন বা পুলিশ ক্যাডার বলেন, সবার ওপর মানুষের আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়। পুরো ঘটনায় মানবতা চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে।’ 
 

সবশেষ উল্লেখিত বিষয় হচ্ছে, আমরা সবাই আইনের উপর আস্থা রাখি। আইনের বিলম্ববনা উপর আঙ্গুল তোলা; সরকার ও সমাজ ব্যাবস্থার জন্য  হুমকিস্বরূপ। 
 

আমাদেরকাগজ/এমটি