বিনোদন প্রতিবেদক
জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুরহস্য ৩০ বছরেও কিনারা হয়নি। তবে গত বছরের অক্টোবরে এ ঘটনায় হত্যা মামলার পর তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের কিছু তৎপরতা দৃশ্যমান হয়। এর মধ্যে গত ৯ আগস্ট খল অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলায় অভিযুক্ত অন্যদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
বাদীপক্ষের আইনজীবী জানিয়েছেন, সালমান শাহ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ তাদের হাতে এসেছে। প্রযুক্তির সহায়তায় বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এসব তথ্য-প্রমাণ থেকে তারা ঘটনাটি প্রামাণ্য পর্যায়ে আনার চেষ্টা করছেন। আদালতে হত্যাকাণ্ড প্রমাণের ব্যাপারে তারা আশাবাদী।
১৯৯৬ সালে শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন ওরফে সালমান শাহর জনপ্রিয়তা যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময় তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটন রোডের ফ্ল্যাট থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার নাকি আত্মহত্যা করেন– সেই প্রশ্নের মীমাংসা এখনও হয়নি। সর্বশেষ গত বছরের ২১ অক্টোবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই আলমগীর কুমকুম রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন।
আসামিদের মধ্যে রয়েছেন– সামিরা হক, লতিফা হক লুছি, আশরাফুল হক ডন, আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভী আহমেদ ফরহাদ। এ ছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।
নীলা চৌধুরী সমকালকে বলেন, সামিরাসহ মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। আমিসহ ইমনের লাখ লাখ ভক্ত বছরের পর বছর সেই সত্য উদ্ঘাটনের জন্য অপেক্ষা করে আছি। আমি আশাবাদী, এবার সন্তান হত্যার বিচার পাব।
তদন্তের গতিপথ
সালমান শাহর লাশের ময়নাতদন্ত করেন ডা. তেজেন্দ্র চন্দ্র দাস। তিনি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ‘ফাঁসের দরুণ ঝুলে শ্বাসরোধ হয়েছে, যা আত্মহত্যাজনিত (সুইসাউডাল ইন ন্যাচার)।’ এ ঘটনায় প্রথমে একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু (ইউডি) মামলা হয়। তবে সালমানকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেন স্বজনরা। সালমানের মা জাতীয় পার্টির সাবেক নেত্রী নীলা চৌধুরী, চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, পুত্রবধূ সামিরা হক, বিউটিশিয়ান রাবেয়া সুলতানা রুবিসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন।
মামলাটি সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করে। তদন্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২১ সালে পিবিআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে নারাজি দেন নীলা চৌধুরী। আদালত তাঁর রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে এ ঘটনায় হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন। রাজধানীর রমনা থানায় করা মামলাটি এখন তদন্ত করছে সিআইডি।
তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের পরিদর্শক মজিবুর রহমান বলেন, গুরুত্বের সঙ্গে এ মামলার তদন্ত চলছে। আসামি ডনের কাছ থেকে মামলা-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। অন্য আসামিদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
সহযোগিতা করছে না পুলিশ: আইনজীবী
সালমান শাহ হত্যা মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদ বলেন, তিন দশক আগের ঘটনা হওয়ায় সারকামস্টানসিয়াল এভিডেন্সের (পারিপার্শ্বিক প্রমাণ) ওপর নির্ভর করতে হবে। ডন-সামিরার ওই সময়ের কিছু ছবি হাতে এসেছে, আমরা এর আলোকচিত্রীকে খুঁজছি। তিনি হয়তো ছবির বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন। ছবির পাশাপাশি সামিরা ও ডনের কথোপকথনের রেকর্ড আছে। বিশেষজ্ঞদের দিয়ে এসব যাচাই করিয়ে কিছু বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হবে।
আইনজীবীর অভিযোগ, তদন্ত সংস্থা মামলার বিষয়ে যথাযথ সহযোগিতা করছে না। ডনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাঁকে মূলত ইমিগ্রেশন পুলিশ আটক করেছিল। সিআইডির তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা অবশ্য তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
রেজভীর ভূমিকা ও পিবিআইয়ের তদন্ত
সালমান শাহ হত্যায় গ্রেপ্তার ফরহাদ আহমেদ রেজভী খুনের দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন বলে জানিয়েছিল পুলিশ। সেই জবানবন্দির ভিত্তিতে চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্তে নতুন মোড় আসে। তবে পরে সিআইডি ও পিবিআইয়ের তদন্তে বলা হয়, জবানবন্দি ছিল সাজানো।
প্রবাসী রেজভী দাবি করেন, নীলা চৌধুরী তাঁকে মিথ্যা জবানবন্দি দিতে বলেন। এতে সালমান হত্যার বিচার পাওয়া সহজ হবে বলে তাঁকে বোঝানো হয়। তিনি রাজি হলে তাঁকে থানা ও আদালত চত্বরে নেওয়া হয়। শেষপর্যন্ত তাঁর কোনো জবানবন্দি নেওয়া হয়নি। অথচ পরে বলা হয়, তিনি জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যায় জড়িত হিসেবে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।






















